Print Date & Time : 18 April 2026 Saturday 8:30 pm

ফিলিস্তিন নিপীড়িত মানবতার প্রতিচ্ছবি

খালিদ হাসান : ফিলিস্তিন, এই একটি নাম উচ্চারিত হলেই বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের হƒদয়ে বেদনার স্রোত বয়ে যায়। কিন্তু এই বেদনা কেবল আবেগের নয়, বরং বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং মানবতার প্রশ্নে গড়া এক জাগ্রত বিবেকের প্রতীক। যুগে যুগে এই ভূমি শুধু রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না, ছিল ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং ন্যায়বিচারের এক অদৃশ্য মিনার। প্রশ্ন উঠতেই পারে, ফিলিস্তিনের প্রতি মুসলমানদের এই গভীর প্রেমের কারণ কী? এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ইসলামের ইতিহাস, ধর্মীয় চেতনা এবং সমকালীন বাস্তবতার দিকে। ফিলিস্তিনের প্রতি মুসলমানদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর দায়বদ্ধতা অনেক প্রাচীন। এর পেছনে রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ধর্মীয় পবিত্রতা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা।

প্রথমত, ফিলিস্তিন মুসলিমদের জন্য ধর্মীয়ভাবে একটি পবিত্র ভূমি। এখানেই অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ, যা ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। এই মসজিদের সাথেই জড়িত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইসরা ও মিরাজের স্মৃতি। মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে আল-আকসা পর্যন্ত মহানবীর রাতের যাত্রা মুসলিম হৃদয়ে এক অবিচ্ছেদ্য আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে।
দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিন বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত ভূমি। অসংখ্য নবী এখানে জীবন অতিবাহিত করেছেন। বহু নবীর জীবনের অংশ এই ভূমি। হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত দাউদ (আ.), হজরত সুলাইমান (আ.), হজরত ঈসা (আ.) প্রমুখ আল্লাহপ্রেরিত নবীরা এই ভূমিতেই তাদের জীবন-সংগ্রাম, শিক্ষা ও দাওয়াতের ইতিহাস গড়েছেন। এই কারণে মুসলমানদের হƒদয়ে ফিলিস্তিন কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়, বরং নবী-প্রেরিত বার্তার ধারক ও বাহক, এক পবিত্র স্মৃতির মিনার। এখানকার প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গেই মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস ও আত্মপরিচয় মিশে আছে।

তৃতীয়ত, বর্তমান ফিলিস্তিন সংকট মানবিক বোধের বড় এক পরীক্ষার ক্ষেত্র। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনের জনগণ দখলদারিত্ব, নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ংকর চক্রে আটকে পড়েছে। জাতিসংঘের রেজুলিউশন, আন্তর্জাতিক আদালতের প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অজস্র বিবৃতি থাকা সত্ত্বেও, ফিলিস্তিনিরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে আজও বঞ্চিত।

বিশেষত, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন আবারও বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ফিলিস্তিন কেবল ভূখণ্ডের সংকট নয়, এটি ন্যায়ের জন্য লড়াইয়ের নাম। অসংখ্য ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষ এবং শিশু ইসরায়েলি বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, এই সহিংসতায় গড়ে প্রতিদিনই শিশুরা মারা পড়ছে, আহত হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ হারাচ্ছে। ইসরায়েলের বিমান হামলা, স্থল অভিযান এবং অবরোধের ফলে ফিলিস্তিন আজ পরিণত হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উš§ুক্ত কারাগারে। এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ নিরাপদ খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের জীবন আজ কেবল অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ইসরায়েলের এই মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো বারবার প্রতিবাদ জানালেও বিশ্ব রাজনীতির স্বার্থান্ধ নীতির কারণে ন্যায়ের পক্ষে জোরালো কোনো সমাধান আজও দৃশ্যমান নয়।

এমন প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিন মুসলমানদের কাছে কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়। এটি আজ ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে চলমান এক দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতীক। মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানো ইমানের অন্যতম দাবি। ফিলিস্তিন তারই জীবন্ত বাস্তবতা। ফিলিস্তিনের ওপর যে অবিচার চলছে তা শুধু একটি জাতির বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা মুসলিম জাতিসত্তা ও বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা মানে শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের ঘোষণা।

বিশ্বের ইতিহাসে দেখা যায়, ফিলিস্তিন সংকট একটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির পণ্য হয়ে পড়েছে। কোনো একটি জাতি যখন দখলদারিত্বের শিকার হয়, তখন পুরো বিশ্ব সেই জাতির পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু ফিলিস্তিনের জন্য এই সমর্থন বহু ক্ষেত্রেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইসরায়েলের সামরিক শক্তির কাছে অসহায় এই জনগণ বারবার বলি হলেও, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আজও অধরা। ফিলিস্তিনের শিশুদের মুখে হাসি নেই। শহরজুড়ে শুধু ধ্বংস আর লাশের স্তূপ। তবুও ফিলিস্তিনি জাতি হার মানেনি। প্রাচীর ভেদ করে বারবার তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এই সাহসিকতা, এই প্রতিরোধ মুসলিম বিশ্বকে শিক্ষা দেয়, ন্যায়বিচার অর্জনের পথ কখনও সহজ নয়, তবুও সত্যের পক্ষে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।

মুসলিমদের জন্য ফিলিস্তিন কেবল নাম নয়, এটি একটি আত্মিক পরিচয়। যেখানেই মুসলমানরা নিপীড়নের শিকার, সেখানেই উম্মাহর হƒদয় কেঁদে ওঠে। ফিলিস্তিন সেই কান্নার সবচেয়ে জ্বলন্ত প্রতীক। এই জন্যই ফিলিস্তিন মুসলমানদের কাছে শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং ইমানের দাবি। ইতিহাস সাক্ষী, ফিলিস্তিনের ভূমি কেবল জুলুম-নির্যাতনের নয়, বরং প্রতিরোধ, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। এই ভূমির স্বাধীনতা মানে কেবল একটি ভূখণ্ডের মুক্তি নয়; বরং তা মানবতার জয়, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর সম্মান পুনরুদ্ধারের এক অনিবার্য শপথ। একটি নির্যাতিত ভূখণ্ডের মানুষের মুক্তি, তাদের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধার এবং বিশ্বশান্তির বাস্তবায়নের জন্য ফিলিস্তিন ইস্যু আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রধান পরীক্ষাকেন্দ্র হয়ে আছে। আজ ফিলিস্তিনের মুক্তি মানে গোটা মানবতার মুক্তি। এই দায়িত্ব শুধু মুসলিমদের নয়, বরং পৃথিবীর প্রতিটি বিবেকবান মানুষের।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়