বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা বেড়েছে

আয়নাল হোসেন: আমনের ভরা মৌসুমে বাড়ছে চালের দাম। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর পাইকারি বাজারে চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি বছর আমন মৌসুমে ধানের উৎপাদন কম হওয়ায় দেশে চালের ঘাটতি হবে। এছাড়া আমন মৌসুমে ধানের মূল্য বেশি থাকায় চালের ওপর প্রভাব পড়েছে। এদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠে অভিযান জোরদার করতে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার বাদামতলী ও বাবুবাজার এলাকার পাইকারি চাল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহ আগে তাদের বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি মিনিকেট চালের দাম ছিল ৫১ থেকে ৫৩ টাকা, যা গতকাল বিক্রি হয়েছে ৫৬ থেকে ৫৮ টাকায়। এতে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা। আর নাজিরশাইল চালের দাম ছিল ৫৪ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকায়। আর মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৪৬ থেকে ৪৭ টাকায়। বিআর-২৮ (লতা নামে পরিচিত) চাল বিক্রি হয়েছে ৪৯ থেকে ৫০ টাকায়, যা আগে ছিল ৪৬ থেকে ৪৭ টাকা।

বাবুবাজার এলাকার মেসার্স ফরিদ রাইস এজেন্সির বিক্রয় প্রতিনিধি মোশারফ হোসেন জানান, মিল মালিকরা চারের দাম প্রতি নিয়ত বাড়াচ্ছেন। তাদের বেঁধে দেওয়া মূল্যে তারা বিক্রি করছেন। আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের দিনের মধ্যে প্রতিকেজি মিনিকেট চাল ৬০ টাকায় বিক্রি করতে হবে বলে মিল মালিকরা তাদের জানিয়েছেন। এ বাজারের মেসার্স জনপ্রিয় রাইস এজেন্সির প্রতিনিধি আবদুস সালাম জানান, মিনিকেট মূলত বোরো মৌসুমের চাল। এই চালের মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফলে দাম প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।

ধানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকের মুখি হাসি থাকলেও এ বছর উৎপাদন কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার শিবপ্রসাদপুর গ্রামের শামসু মাস্টার জানান, গত বছর প্রতিমণ ধান তারা ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। এ বছর প্রতিমণ ধান তারা এক হাজার ৪০ থেকে এক হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে গত বছর প্রতি ১০ শতাংশ জমিতে ধান উৎপাদিত হয়েছিল চার থেকে পাঁচ মণ। এ বছর হয়েছে তিন থেকে সাড়ে তিন মণ। সব মিলে গড়ে গত বছরের মতো সমান পরতা পড়েছে বলে জানান তিনি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে চালের মজুত রয়েছে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন। সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার ছাড়াও বিশ্ববাজার থেকে চাল সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। চলতি বছর আমন মৌসুমে দুই লাখ টন ধান, ছয় লাখ টন সেদ্ধ এবং ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সে লক্ষ্যে গত ৭ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে এ বছর দেশের মিল মালিকরা সরকারকে চাল সরবরাহ দিতে পারছেন না বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রাজধানীর পাইকারি বাজারে প্রতিকেজি সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৫৩ থেকে ৫৪ টাকায় এবং খুচরায়

৫৫ থেকে ৫৭ টাকায়, মাঝারি মানের পাইকারি পর্যায়ে প্রতিকেজি চাল ৪৬-৪৭ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত ৭ নভেম্বর থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক মাসের ব্যবধানে সরকার আমন চাল সংগ্রহ করেছে তিন হাজার ৪৭৬ টন, আতপ চাল ১৫ টন ও আমন ধান ৫৩ টন।

বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি জাকির হোসেন রনি জানান, চলতি আমন মৌসুমে গত বছরের চেয়ে ১০ লাখ টন উৎপাদন কম হয়েছে। এ কারণে গত বছর যে ধানের দাম ছিল ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা, গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৪৬ টাকায়। চলতি বছর কেজিপ্রতি চালে ১০ টাকা দামের পার্থক্য রয়েছে।      

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিন মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী শেয়ার বিজকে বলেন, চলতি আমন মৌসুমে দেশে চালের ঘাটতি রয়েছে। ওই ঘাটতি পূরণের জন্য এ বছর তারা সরকারকে চাল সরবরাহ দিতে পারছেন না। বিদেশ থেকে ১০ লাখ টন চাল আমদানির সুপারিশ তাদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে সরকার হাঁটছে। এ বছর ধানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হয়েছেন। মোকামে প্রতি ৪০ কেজি মোটা ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১৪০ টাকায়। আর সরু ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকায়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম শেয়ার বিজকে বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে অভিযান জোরদারে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মিল মালিকদের সঙ্গে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বৈঠক শেষে চালের মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ওই নির্ধারিত মূল্যের বাইরে কেউ চড়া দামে বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাদ্য সচিব আরও জানান, প্রতি বছর ধানের উৎপাদন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়ে থাকে। এই বিষয়টি যাতে না ঘটে সেজন্য তিনটি সংস্থা একত্রে ধান উৎপাদনের তথ্য সংগ্রহ করছে। তাদের হিসাবমতে, চলতি বছর আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৫৬ লাখ টন। তবে উৎপাদন হবে এক কোটি ৫০ লাখ টনের মতো। তবে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে নির্ধারিত মূল্যে তারা চাল সংগ্রহ করতে পারছেন না। এজন্য ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। খুব শিগগিরই এই চাল দেশে পৌঁছাবে বলে জানান তিনি।