Print Date & Time : 20 April 2026 Monday 6:45 am

বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ প্রয়োজন

 

মাহমুদুল হক আনসারী: বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। ঢাকার পর চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব আয়ের অন্যতম অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়। এখানে বাংলাদেশের প্রধান বন্দর রয়েছে। প্রতিদিন শত শত মালবাহী গাড়ি বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি জমায়। চট্টগ্রামে উৎপাদিত নানা পণ্যসামগ্রী দেশ-বিদেশে রপ্তানি করা হয়। দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে নানা ধরনের পণ্য আসা-যাওয়া করে। চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট সর্বদা পণ্যবাহী গাড়ির চাপে ব্যস্ত থাকে। সব ধরনের ব্যবসার অসংখ্য অফিস চট্টগ্রামে রয়েছে। বাংলাদেশের সব জেলার মানুষসহ বিদেশি নাগরিকরাও এখানে বসবাস করেন। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন অগ্রগতির অংশীদার চট্টগ্রাম। ইপিজেড, কেপিজেডসহ চট্টগ্রামজুড়েই রয়েছে নানা ধরনের শত শত শিল্পকারখানা। অর্থনীতির অন্যতম উৎপাদন ঘাঁটি চট্টগ্রাম।

চট্টগ্রাম যেভাবে দেশের জাতীয় অর্থনীতির জন্য অবদান রাখছে, তার তুলনায় চট্টগ্রামের জনগণ নানাভাবে রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত। অনেক সেবা প্রতিষ্ঠান রাজধানীতে স্থানান্তর করা হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনগণের জন্য গড়ে তোলা পাহাড়তলী হাজী ক্যাম্পটি এখন পর্যন্ত বন্ধ। সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডার আসর বসে। অবৈধ বসবাসকারীদের দখলে ক্যাম্পটি পড়ে আছে। একশ্রেণির সরকারি কর্মচারী নানাভাবে ফায়দা গ্রহণ করছে। হাজী ক্যাম্প নিয়ে এর আগেও অনেক লেখকই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন। আজ পর্যন্ত ওই বিষয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। স্থানীয় গণ্যমান্য মানুষ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আবেদন-নিবেদন করেছেন। তবুও কোনো সুসংবাদ নেই বলা চলে। চট্টগ্রাম নামে বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও বাস্তবিকভাবে চট্টগ্রামের জনগণ নানা ধরনের সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হন।

চট্টগ্রাম সিটি এলাকায় প্রায় ৮০ লাখের অধিক মানুষের বসবাস। এখানে অসংখ্য রাস্তাঘাট রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে বিপুলসংখ্যক নালানর্দমা। মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট ইপিজেড এলাকার নালা-নর্দমায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। সেই নালার ময়লাগুলো রাস্তার ওপরে জমাট করে রাখতে দেখা যায়। সেই নালার ময়লা আবার বৃষ্টি ও ধুলাবালির সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে। রাস্তার ওপর হকার মার্কেট থেকে রাস্তার যত্রতত্র ময়লা ফেলা হচ্ছে। রাস্তার মধ্যে দোকান ও বাজার থাকায় মনে হয় স্থানীয় প্রশাসন দেখেও দেখছে না। অপরিষ্কার ও অপরিচ্ছন্নভাবে নগরীর উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিম ৪১টি ওয়ার্ডের সবখানে ময়লা আবর্জনায় ভরপুর। বাসাবাড়ির সব ময়লা আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট নালা ও রাস্তার মধ্যে নিত্যদিন ফেলা হচ্ছে। এসব ময়লা নালায় জমছে। আর পলিথিন, উচ্ছিষ্ট, পানির বোতলসহ নানা জাতের প্লাস্টিক সামগ্রী কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে এবং নাব্য ধ্বংস হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।

ফলে এসব অপরাধকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। বর্ষার আগে নালার ময়লা আবর্জনা পরিচ্ছন্ন করে পানি চলাচলের জন্য এখন থেকে নালাগুলো তৈরি করা দরকার। ফুটপাত ও রাস্তা থেকে হকার ও বাজার সরিয়ে ফেলা উচিত। তাদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ব্যবহারের উপযোগী করে জায়গা তৈরি করা হোক। আরও বেশ কিছু এলাকার নালা সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। নগরীর অসংখ্য নালা ময়লায় ভর্তি অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। শহরের বাসাবাড়ির ময়লা আবর্জনার ভাগাড় রাস্তার মোড়ে মোড়ে ও নানা ড্রেনের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অলংকার, সাগরিকা মোড়, আগ্রাবাদ চোট পুল, বহদ্দার হাট পানি উন্নয়ন বোর্ড, নতুন চাঁদগাউ থানাÑনগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে দিনের পর দিন বাসাবাড়ির ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমে থাকতে দেখা যায়। দিনের বেলায় ময়লার গাড়ির খোলা ট্রাকের দুর্গন্ধে রাস্তায় জনচলাচল মারাত্মকভাবে হুমকিতে পড়ে। নাকেমুখে রুমাল দিয়েও দুর্গন্ধ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হয় না। বলা যায়, পুরো শহরেই যত্রতত্র ময়লার স্তূপ দিনের পর দিন জমে থাকে।

বাসাবাড়ি, দোকান ও অফিস পাড়ার ময়লা-আবর্জনার সরাসরি ড্রেনে ফেলা হচ্ছে। রাস্তা পরিষ্কার করে সেই আবর্জনা পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা নালায় ফেলতে মোটেও চিন্তা করে না। চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দার হাট, মুরাদপুর ও ষোলোশহর ২নং গেটে উত্তর পাশে নালার সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ অনেক দিন থেকেই দেখা যাচ্ছে। কাজের কর্মসূচি চলমান আছে। ধীরগতিতে কাজের কারণে ওই এলাকার ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতি ও ভোগান্তি হচ্ছে। মুরাদপুর থেকে বহদ্দার হাট পর্যন্ত বিশ্বরোডের দক্ষিণ পাশে অনেকগুলো কাঠের দোকানের ব্যবসা। এন মোহাম্মদ অফিস থেকে রাস্তার দক্ষিণ পাশে সারি সারি কাঠের দোকান। তারা দীর্ঘদিন থেকে এখানে কাঠের ব্যবসা করছেন। তাদের বড় বড় কাটা গাছ ও সাইজ করা কাঠ দোকান থেকে ফুটপাত দখল করে রাস্তা পর্যন্ত এসে গেছে। সেদিকের বড় বড় ড্রেনের ওপর কোনো সø্যাব রাখা হয়নি। নালা আছে, কিন্তু নালার ওপর চলাচলের ব্যবস্থা নেই। সেই ব্যবসায়ীরা নালার ওপর দোকান বসিয়ে কাঠের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। বহদ্দার হাট পুলিশ বিট পর্যন্ত কাঠ ব্যবসায়ীদের দখলে রয়েছে নালা ও ফুটপাত। প্রতিদিন স্থানীয় ও চট্টগ্রামের নানা অঞ্চলে যাতায়াতকারী জনগণ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। দেখা যায়, এসব ব্যবসায়ী কাঠের সব উচ্ছিষ্ট প্রতিনিয়ত নালাতেই ফেলছে। এটি তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষার সময় সে এলাকায় বৃষ্টির পানি নালায় ধারণ করা সম্ভব হয় না। নালা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয় না। অসংখ্য ময়লা আবর্জনায় ওই অঞ্চলের ড্রেন ভরপুর। স্থানীয় এলাকার কমিশনার নিশ্চয় এই বিষয়টি অবগত আছেন। কিন্তু তবুও তার কোনো প্রতিকার বা সংশোধন জনগণ দেখছে না। এসব কারণে মুরাদপুর বহদ্দার হাট এলাকায় বৃষ্টির সময় জনভোগান্তির কথা জনগণ বলছে। অভিযোগে জানা যায়, স্থানীয় কমিশনার দেখেও না দেখার ভান করছে। ফলে এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার প্রভাব থেকে জনগণ মুক্তি পাচ্ছে না। সচেতন স্থানীয় নাগরিক সিটি করপোরেশনকে এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে নালাকে অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। জনগণের প্রত্যাশাÑসিটি মেয়র উপরোক্ত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে চট্টগ্রামের নালা ও ড্রেনগুলো দখলমুক্ত করবে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে বর্ষা মৌসুমে নালার পানি চলাচলে জনভোগান্তি লাঘবে সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। নালার ওপর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। উš§ুক্ত নালাগুলোকে উপযোগী করে তৈরি করতে হবে।

নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই প্রায় ফুটপাত হকারের দখল। এরই মধ্যে শহরের কিছু স্পটে হকারদের উচ্ছেদ করলেও আবার তারা ফুটপাত দখল করছে। তাদের জন্য নির্দিষ্টভাবে বসার জায়গা করা যেতে পারে। রুজি-রোজগারের জন্য চিন্তা করা দরকার। অন্যথায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। নগরবাসী জীবন-জীবিকার জন্য ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছে না। অনেক সময় জনগণ হকারদের তোপের মুখে পড়ে। প্রতিবাদ করলেই ঝগড়া লেগে যায়। কোনো কোনো হকার স্থানীয় কমিশনার এবং রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে তাদের চাঁদা দেয়ার কথা বলে। বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে ফুটপাত থেকে হকারদের সরাতে দেখা যায়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার একই চিত্র শুরু হয়। হকাররা ফুটপাত দখল করে তাদের ব্যবসা চালাচ্ছে। তাদের ব্যবসার জন্য মোটেও নগরবাসীর কোনো অভিযোগ নেই। তারা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করুক, সেখানে জনগণের কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি হলো জনচলাচলের ফুটপাত যেন সবসময় উš§ুক্ত থাকে, সে দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে জনস্বার্থে পালন করতে হবে। নালার ওপর সব ধরনের ব্যবসায়িক দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করতে হবে। নালাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নগরবাসীকে সর্বদা সচেতন করার প্রয়োজনীয় কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। নালার ওপর অবৈধ আবর্জনা যারা ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি সচেতন জনগণের। প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনকে জরিমানার বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে। একতরফাভাবে সিটি করপোরেশনের ওপর অথবা সেবা সংস্থাকে দোষারোপ করলে চলবে না, নগরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে নগরবাসীরও দায়িত্ব রয়েছে। ময়লা আবর্জনা নির্দিষ্ট জায়গায় স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ফেলতে হবে। নগরীর সব সেবা সংস্থাকে সমন্বয় ও পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম চালাতে হবে। বর্ষার আগেই সব নালা যেন পরিচ্ছন্নতার আওতায় আনা হয়। মশার যন্ত্রণায় পুরো নগরবাসী অতিষ্ঠ। মশা নিধনে কার্যকর মশার ওষুধ পুরো সিটি করপোরেশন এলাকায় একযোগে ব্যবহার করা হোক।

 

মুক্ত লেখক, চট্টগ্রাম