মো. মিঠুন: শারীরিকভাবে নীরোগ থাকাকেই প্রকৃত সুস্থতা বলা যায়। সুস্বাস্থ্য অর্জন প্রতিটি মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ মনে করে, সুস্থভাবে বাঁচার জন্য চিকিৎসাই একমাত্র ব্যবস্থা, যা নিতান্তই ভুল। ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২২ শতাংশ, যা আগের তুলনায় কম। কিন্তু অন্যদিকে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বর্তমানে এটি মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে বছরে ৮৬ লাখ মানুষ গৃহহীন ও দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে শুধু স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা খরচ জোগাতে গিয়ে। বর্তমানে দেশে মানুষের মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয় বছরে পাঁচ হাজার টাকারও বেশি, যা ব্যক্তির মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ করতে হয় নিজস্ব পকেট থেকে। এভাবে যদি প্রতিনিয়ত চিকিৎসা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা তৈরি করবে, যা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। বর্তমানে বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা খরচ আকাশচুম্বী, সেখানে চিকিৎসা নেয়া অনেকেরই সামর্থ্যরে বাইরে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের খরচ কম হলেও অতিরিক্ত রোগীর চাপে এবং প্রয়োজনের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় প্রত্যাশিত এবং সুষ্ঠু চিকিৎসা পাওয়া যায় না, যার ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাই দিন দিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অসংক্রামক রোগসহ নানা রোগব্যাধী। বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর ৬৯ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে হচ্ছে। এসব রোগের প্রকোপ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিটি পরিবারেই এক বা একাধিক ব্যক্তি অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে প্রতি বছর বহু মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ তরুণ, যাদের বয়স ২৫ থেকে ২৯ বছর। এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৯ শতাংশ।
সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের বার্ধক্যজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়। চলমান হারে অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পেতে থাকলে, বহুসংখ্যক মানুষকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা বেশ কষ্টকর হবে। গত ১০ বছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। আগামী ১০ বছরে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। সে হিসাবে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত টাকা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলেও রাষ্ট্রের জন্য তা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। ভাবনার বিষয় এই যে, এত বিশাল জনগোষ্ঠীর বোঝা নেয়ার মতো সক্ষমতা রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের আছে কি? দেশ ও উন্নত জাতি গঠনে ভবিষ্যৎ প্রজš§কে সুস্থতার সঙ্গে মানসিক, দৈহিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য তাদের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বাতাস, ভূমি, বাসস্থান, হাঁটা, জলাধার ও উš§ুক্ত স্থান, খেলাধুলা, শরীরচর্চা প্রভৃতি বিষয় নিশ্চিত করা দরকার। প্রতি বছর বাজেট আসে বাজেট যায়, যার সুবাদে প্রতিবছর ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বরাদ্দকৃত অধিকাংশই অর্থ ব্যয় হচ্ছে ডাক্তার-নার্স অবকাঠামো, যন্ত্রাংশ, ওষুধ প্রভৃতি খাতে। ২০১২ থেকে ২০২২ সালে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চারগুণ। কিন্তু সে অনুপাতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আজও সে হারে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, জীবনমান নির্ভর করে শারীরিক স্বাস্থ্য, মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক ও পরিবেশের ওপর। শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসার তুলনায় মানুষের সুস্থতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, যেমন ফাস্ট ফুড, জাংক ফুড, চিপস, কোমল পানীয় ও প্যাকেটজাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এর ফলে স্বাস্থ্যব্যয় ও রোগের হার দুটিই অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিবেশী দেশ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের প্রায় ২৩টি দেশ স্বাস্থ্যহানিকর পণ্যের ওপর কর ও সারচার্জ আরোপ করে সে অর্থে হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ফাউন্ডেশনগুলো জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। তাদের উদ্যোগগুলোকে মডেল হিসেবে সামনে রেখে আমরাও আমাদের দেশে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ‘হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন তৈরি করতে পারি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাস্থ্য খাত-বিষয়ক কর্মপরিকল্পনায় স্বাস্থ্যচিন্তা ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত, যুগোপযোগী, আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী। জাতির পিতার পরিকল্পনাকে অগ্রসর করতে সরকারপ্রধান হিসেবে দেশের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় সরকারপ্রধানের সুদৃষ্টি ও সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় কমাতে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে এমন একটি সংগঠন তৈরি করা যেতে পারে, যা হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন নামে পরিচিতি পাবে, যার মাধ্যমে অস্বাস্থ্যকর পণ্য, যেমন কোমল পানীয়, তামাক, ফাস্ট ফুড, জাংক ফুড ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্যের ওপর নির্ধারিত কর আরোপ করে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা যাবে। এছাড়া সরকারের বিদ্যমান কমিউনিটি ক্লিনিক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে হেলথ প্রমোশনের বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন-বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণুালয়গুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন-বিষয়ক দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সব পর্যায়ের মানুষ, পরিবেশকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা এবং সবার মতামত যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা গেলে আমরাও একদিন বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাছে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হবো। চিকিৎসা খাতে বরাদ্দের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে অল্প পরিমাণে বিনিয়োগ দুই শতাংশও যদি করা যায়, তাহলে এর মাধ্যমে সহজে চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশের চলমান উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রগুলোয় গুরুত্ব প্রদান করা হলে ‘ভিশন ২০২১-২০৪১’-এর স্বাস্থ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশই তরুণ। আগামী ২০ বছরে যারা বার্ধক্যে উপনীত হবে। আগে থেকে বার্ধক্যের সময়গুলো সুরক্ষিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
উন্নয়নকর্মী