গত দেড় দশকে জ্বালানি খাতে আশানুরূপ সুসংবাদ মেলেনি। একদিকে ফুরিয়ে আসছে মজুত, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে গ্যাস খাতে। এর মধ্যে গত বছর রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয় গ্যাসের দাম। এরপরও স্বাভাবিক হয়নি জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি। তাই গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটির বিভিন্ন দিক নিয়ে অনুসন্ধান করেছে শেয়ার বিজ। তা নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের আজ ছাপা হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব
ইসমাইল আলী: দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ক্রমেই কমছে। গত জুন শেষে উত্তোলনযোগ্য মজুতের মাত্র ৩২ শতাংশ অবশিষ্ট ছিল। সর্ববৃহৎ উৎস মার্কিন কোম্পানি শেভরনের ক্ষেত্রগুলোয় গ্যাস ফুরিয়ে আসছে। দেশীয় কোম্পানিগুলোও সরবরাহ বাড়াতে পারছে না। অন্যদিকে এক দশকের বেশি আগে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মীমাংসা হলেও, গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে গ্যাস উৎপাদনে। গত অর্থবছর দেশে গ্যাস উৎপাদন ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছর দেশে গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৬৪৫ দশমিক ৬১৪ মিলিয়ন ঘনমিটার। এর আগের (২০২১-২২) অর্থবছর গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৭৮৩ দশমিক ১০৪ মিলিয়ন ঘনমিটার। অর্থাৎ গত অর্থবছর গ্যাস উৎপাদন কমেছে এক হাজার ১৩৭ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন ঘনমিটার বা চার দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর আগের (২০২১-২২) অর্থবছরও গ্যাস উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল।
এক যুগ তথা ১২ বছরের মধ্যে গত অর্থবছরের চেয়ে কম গ্যাস উৎপাদন হয়েছিল ২০১১-১২ অর্থবছর। ওই অর্থবছর দেশে গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৫৯ দশমিক ২৩৯ মিলিয়ন ঘনমিটার। তবে পরের দুই অর্থবছর গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছর ২৩ হাজার ২৩১ দশমিক ৯২৮ মিলিয়ন ঘনমিটার ও ২০১৪-১৫ অর্থবছর ২৫ হাজার ২৬৩ দশমিক ৪৫১ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গ্যাস উৎপাদন কমার মূল কারণ হচ্ছে দেশে কার্যরত বহুজাতিক কোম্পানি (আইওসি) শেভরনের ক্ষেত্রগুলোয় গ্যাস ফুরিয়ে আসা। এতে গত দুই অর্থবছর ধরেই গ্যাস উৎপাদনে আইওসির হিস্যা কমছে, যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক গ্যাস উৎপাদনে। আগামীতে শেভরনের অধীনে থাকা ক্ষেত্রগুলোয় গ্যাস ফুরিয়ে যাবে। তাই দেশীয় কোম্পানিগুলো উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে না পারলে গ্যাস খাতে দুই-তিন বছরের মধ্যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম শেয়ার বিজকে বলেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শেভরনের সরবরাহকৃত গ্যাস অভাবনীয় হারে কমে যাবে। তাদের বর্তমান উত্তোলন যদি অর্ধেকে নেমে যায়, সে পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার মতো সক্ষমতা দেশীয় কোম্পানিগুলোর নেই। এটি নিয়ে বড় আকারের কোনো পরিকল্পনাও নেয়া হয়নি। তাই কয়েক বছরের মধ্যে গ্যাস খাতে মহাসংকট আসতে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, কয়েক বছর ধরে দেশে সবচেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করছে মার্কিন কোম্পানি শেভরন।
কোম্পানিটির অধীন তিনটি ক্ষেত্রে গ্যাস মজুত ছিল সাত দশমিক ৬১২৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে সাত দশমিক ৫৪২৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়ে গেছে। অর্থাৎ শেভরনের অধীন ক্ষেত্রগুলো থেকে ৯৯ শতাংশের বেশি গ্যাস মজুত শেষ। বর্তমানে কোম্পানিটির অধীন জালালাবাদ ক্ষেত্রে গ্যাস মজুত শূন্যের কাছাকাছি। আর মৌলভীবাজার ও বিবিয়ানায় সামান্য গ্যাস মজুত রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত অর্থবছর গ্যাস উৎপাদনে আইওসির হিস্যা ছিল ৬২ শতাংশ, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডসের ২৭ শতাংশ, সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের চার শতাংশ ও বাপেক্সের ছয় শতাংশ। যদিও দুই অর্থবছর আগে গ্যাস উৎপাদনে আইওসির হিস্যা ছিল ৬৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছর তা কমে হয় ৬৩ শতাংশ। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বেশি গ্যাস মজুত আছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের কাছে। ওই দুই কোম্পানির কাছেই মোট মজুতের ৮৫ শতাংশ রয়েছে। তবে তারা তুলনামূলক কম গ্যাস উত্তোলন করছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, এক যুগের মধ্যে দেশে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছর। ওই অর্থবছর গ্যাস উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৫৫৯ দশমিক ২৫৫ মিলিয়ন ঘনমিটার। এর পরের অর্থবছর গ্যাস উৎপাদন কিছুটা কমে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৪৪৫ দশমিক ৩৬৪ মিলিয়ন ঘনমিটার। তা আরও কিছুটা কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছর হয় ২৭ হাজার ৪২৯ দশমিক ৯৮৩ মিলিয়ন ঘনমিটার ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২৭ হাজার ২৩২ দশমিক ৫৯৭ মিলিয়ন ঘনমিটার।
এদিকে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর ২০২০ সালের ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) দেশের প্রায় সব ধরনের শিল্প-কারখানা বন্ধ ছিল। ওই সময় চাহিদা কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় অর্ধেকই বন্ধ রাখা হয়, পরিবহন বন্ধ থাকায় সিএনজির চাহিদা হ্রাস পায়, সার কারখানাগুলোও বন্ধ ছিল। সার্বিকভাবে অর্থনীতি স্থবির হয়ে যায়। এতে চাহিদা কমায় ২০১৯-২০ অর্থবছর গ্যাস উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৯৯২ দশমিক ৮৫২ মিলিয়ন ঘনমিটার।
পরের (২০২০-২১) অর্থবছর অর্থনীতি আবার পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় গ্যাস উৎপাদন বেড়ে হয় ২৫ হাজার ১৭৩ দশমিক ৬৩৯ মিলিয়ন ঘনমিটার। তবে চাহিদা থাকার পরও গত দুই অর্থবছর ধরে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না, বরং কমছে।
উল্লেখ্য, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুতের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৯২৬৫ টিসিএফ। এর মধ্যে গত জুন পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে ২০ দশমিক ৩৫৩৪ টিসিএফ, যা মজুতের ৬৮ শতাংশ। ওই সময় দেশে অবশিষ্ট গ্যাস মজুত ছিল ৯ দশমিক ৫৭৩১ টিসিএফ বা ৩২ শতাংশ। যদিও অবশিষ্ট মজুত থেকে কিছু গ্যাস উত্তোলন করা যাবে না।