দেড় দশকে ক্যাপাসিটি চার্জ

বিদেশি ৮ কোম্পানিতে গেছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়লেও বড় অংশই বসে থাকছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে প্রচুর আয় করেছে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন করে আলোচনায় আসে ক্যাপাসিটি চার্জ। তাই ১৫ বছরে এ খাতে সরকারের ব্যয় ও কোম্পানিগুলোর আয় তুলে ধরেছে শেয়ার বিজ। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের আজ ছাপা হচ্ছে তৃতীয় পর্ব

ইসমাইল আলী: আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে দেশীয় কোম্পানির পাশাপাশি কিছু বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। তবে এর আগেও বাংলাদেশে কয়েকটি বিদেশি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। আবার কয়েকটির চুক্তির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। বিদেশি মালিকানাধীন এসব কেন্দ্রের জন্য দেড় দশকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার ১১৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

এর বাইরে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় নির্মিত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনছে বাংলাদেশ। ভারতে নির্মাণ করা হলেও কেন্দ্রটিকে বাংলাদেশে নির্মিত যে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা দেয়া হয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জও ধরা হয়েছে অনেক বেশি হারে। এ কেন্দ্রটির জন্য মাত্র ১৫ মাসেই ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে পাঁচ হাজার ৬১৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে বিদেশি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য গত ১৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পিডিবির হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ১৫ বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ গেছে এ খাতে ব্যয়ের ২৪ দশমিক ৬০ শতাংশ অর্থ।

পিডিবির তথ্যমতে, ২০০৯-১০ অর্থবছর বাংলাদেশে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনালের ৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মাত্র একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এ কোম্পানিটি ২০১০-১১ অর্থবছর আর ছয়টি রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। সব মিলিয়ে সে সময় কোম্পানিটির উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় ৩৯০ মেগাওয়াট। পরে তারা আরও কয়েকটি কেন্দ্র স্থাপন করে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮০ মেগাওয়াট। তবে ধীরে ধীরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে এগ্রিকোর কোনো কেন্দ্রই উৎপাদনে নেই।

এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনালের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগ সময়ই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হতো না। এছাড়া কোম্পানিটিকে নানা সময়ে বিভিন্ন ধরনের বাড়তি সুবিধাও দেয়া হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যেই কোম্পানিটির সবগুলো কেন্দ্র অবসরে চলে গেছে। তবে গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে গেছে এগ্রিকো, যার পরিমাণ আট হাজার ৩৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ থেকে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনালের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়া প্রসঙ্গে পিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল দিয়ে কোম্পানিটি নানা ধরনের অন্যায্য সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ ঘোড়াশালে নির্মিত ১৪৫ মেগাওয়াট দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক (গ্যাস ও ডিজেল) বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে ২০১০ সালের ২৩ আগস্ট। প্রথমে ডিজেলে ১৮ মাস চললেও পরে তা গ্যাসে উৎপাদন শুরু করে। উৎপাদন শুরুর সময় কুইক রেন্টাল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ ধরা হয়েছিল ২১ ডলার।

তিন বছরের জন্য কুইক রেন্টাল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। এ কেন্দ্রটি নির্মাণে এগ্রিকো বিনিয়োগ করেছিল ১০ কোটি ডলার বা ৫৬০ কোটি টাকা। আর তিন বছরে পিডিবি ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করত ১০ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ মুনাফাসহ তিন বছরে বিনিয়োগ তুলে নিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল।

যদিও হঠাৎ করে মাঝপথে বাড়ানো হয় চুক্তির মেয়াদ। ১৮ মাস বাকি থাকতেই আরও ৩৬ মাসের জন্য নবায়ন করা হয় চুক্তি। সে সময় প্রতি মাসে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য ২১ ডলারের ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়িয়ে ৩০ ডলার করা হয়। এতে মাসিক ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে সাড়ে চার বছরে এগ্রিকো মোট ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করে ২১ কোটি ১৪ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ বিনিয়োগের দ্বিগুণের বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করে নেয় কোম্পানিটি।

এখানেই শেষ নয়; পরে চুক্তির মেয়াদ আরও সাড়ে তিন বছর বাড়ানো হয়। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১৮ সালে অবসরে যায়। অর্থাৎ তিন বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চলেছে আট বছর। সব মিলিয়ে এ আট বছরে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল মোট ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করেছে দুই হাজার ৫০২ কোটি টাকা। অথচ কোম্পানিটির বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৫৬০ কোটি টাকা। এ হিসাবে বিনিয়োগের প্রায় সাড়ে চারগুণ বা ৪৫০ শতাংশ অর্থ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে আদায় করেছে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল।

এদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে উৎপাদনরত বিদেশি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দক্ষ মালয়েশিয়াভিত্তিক সিডিসি এনার্জি। বিগত বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশে কোম্পানিটিকে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল, যার উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৮১০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৩৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার হরিপুর পাওয়ার গত অর্থবছর অবসরে গেছে। আর ৪৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেড বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে, যা চলতি অর্থবছর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে সিডিসি মালয়েশিয়া ১৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে গেছে সাত হাজার ৯৭৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে গত অর্থবছর পিডিবি থেকে সর্বোচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করেছে ভারতের আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য চার হাজার ৯৮০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছর এপ্রিলে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট চালু হয়। দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু হয় জুনের শেষ দিকে। ওই অর্থবছরের ক্যপাসিটি চার্জ ছিল ৬৩২ কেটি ৫৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে আদানি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করেছে পাঁচ হাজার ৬১৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

পিডিবির তথ্যমতে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক সেম্বকর্প ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশের নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৪১৪ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে বাংলাদেশে। গ্যাসচালিত কম্বাইন্ড সাইকেল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য এ পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে তিন হাজার ৬১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সিরাজগঞ্জে নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৭১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সেম্বকর্পের হাতে। বাকি ২৯ শতাংশের মালিকানা বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির কাছে রয়েছে।

এদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর বাংলাদেশে ৩০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে যুক্তরাষ্ট্রের এপিআর এনার্জি। ডিজেলচালিত এ কেন্দ্রটির জন্য পাঁচ বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে দুই হাজার ৮৪২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের শুরুর দিকেই কেন্দ্রটি অবসরে গেছে। যদিও প্রায় সময়ই এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বসে থাকত। এতে নামমাত্র উৎপাদন করা হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি পড়ে।

অন্যদিকে ২০১৪-১৫ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করে শ্রীলঙ্কার লঙ্কা গ্রুপের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ কোম্পানি লক্ষধনভি। এর আগে (২০১৩-১৪ অর্থবছর) লক্ষধনভির সহযোগী রাজলঙ্কা পাওয়ার বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতাই ৫২ মেগাওয়াটের। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছর লক্ষধনভির সহযোগী আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। ফেনীলঙ্কা নামে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন সক্ষমতা ১১৪ মেগাওয়াট। তিন কেন্দ্র মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে লঙ্কা গ্রুপের উৎপাদন সক্ষমতা ২১৮ মেগাওয়াট। এ তিন কেন্দ্রের লক্ষধনভি ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে এক হাজার ৮৩৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

যদিও বাংলাদেশে বেসরকারি তথা বিদেশি বিনিয়োগের প্রথম বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র হরিপুর বার্জমাউন্টেড পাওয়ার প্ল্যান্ট। ১৯৯৮ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউ ইংল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি। এনইপিসি কনসোর্টিয়াম নামে প্রতিষ্ঠিত ২০ বছর মেয়াদি এ কেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৮-১৯ অর্থবছর। এতে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত ১০ বছরে কেন্দ্রটির জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে এক হাজার ৩৬৭ কোটি সাত লাখ টাকা।

এর বাইরে ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ দিকে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে ভারতীয় নতুন বিদ্যুৎ কোম্পানি। দেশটির শাপুরজি পালনজি গ্রুপের এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য সে অর্থবছর কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়নি। তবে পুরোদমে উৎপাদন শুরুর পর ২২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ কেন্দ্রটির জন্য বিদায়ী অর্থবছর পর্যন্ত পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে এক হাজার ১৫৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন

প্রথম পর্ব: ১৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ শোধ ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা

দ্বিতীয় পর্ব: দেশীয় ২৩ কোম্পানির পকেটে ৯৫ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা

শেষ পর্ব: ১১ বছরে ভারত নিয়ে গেছে ১৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা