আধুনিক যুগে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করা যাবে না। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই। বর্তমান সভ্যতাকে বিদ্যুৎনির্ভর সভ্যতা বললেও অত্যুক্তি হবে না। বিদ্যুৎ ও উন্নয়ন এখন প্রায় সমার্থক। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তির বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ যখন এতই অপরিহার্য তখন বলা যায়, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘ভর্তুকি না দিলে বিদ্যুতের দাম পড়বে ১৪.২৯ টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদন আমাদের হতাশ করবে। গত অর্থবছর ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ছিল ৮ টাকা ৯৬ পয়সা এবং গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় ছিল ভর্তুকি বাদে ১১ টাকা ২৬ পয়সা। বর্তমানে ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয় ৭ টাকা ১৩ পয়সায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দুই বছর ধরে অস্বাভাবিক বাড়ছে। এতে ঘাটতি বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও বিদ্যুতের দামের মধ্যে।
দেশের শতভাগ মানুষই বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। এখন বিদ্যুতের দাম যদি বাড়ে তাহলে সেটির প্রভাব পড়বে সব মানুষের ওপর। এর অভিঘাত আসবে সব দিক থেকেই। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে উৎপাদন, রপ্তানি, কৃষি এমনকি শিক্ষা খাতেও। কেননা উৎপাদনে ব্যয় বাড়লে শিক্ষা উপকরণের দামও বাড়বে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতি মাসে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাবও উঠেছে। ফলে প্রতিমাসেই নাগরিকদের ব্যয় বাড়বে। সাধারণ মানুষ যাতে আপত্তি করতে না পারে, সে জন্য সরকার একটি কৌশলও নেয়া হয়েছে। আগে গ্যাস-বিদ্যুতের পাইকারি দাম নির্ধারণ করা, পরে ভোক্তা পর্যায়ে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্পোদ্যোক্তারা দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে বিদ্যুৎ খাতে চুরি, অপচয় ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধে জোর দিয়েছেন। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর দেয়া হিসাবের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন একজন জ্বালানি-বিশেষজ্ঞ। অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা ও জ্বালানি-বিশেষজ্ঞদের যুক্তি বিবেচনা না করে বিতরণ সংস্থাগুলোর প্রস্তাবে সায় দেয়া সমীচীন হবে বলেই আমরা মনে করি।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে,
সে সময় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
এমনিতেই দেশবাসী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আছে। অবশ্য সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমছে। তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়বে।
বিদ্যুৎ-সংকটে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে বেতন বৃদ্ধির দাবিও উঠবে। কীভাবে বহুমুখী অভিঘাত মোকাবিলা করবে রাষ্ট্র! মানুষের ওপর নতুন চাপ না দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে যে চুরি, অপচয় ও কমিশন বাণিজ্য চলছে, তা বন্ধ করা হতো গণমুখী সিদ্ধান্ত। সরকারের উচিত হবে গণবিরোধী সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে চুরি-অপচয় বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। তাহলে বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখা সম্ভব।