সায়মা নাসরিন: একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিদ্যুৎ ছাড়া আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি দিনের কথাও ভাবতে পারি না। বর্তমান মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজ করে দিয়েছে এই বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎকে একেবারে মৌলিক চাহিদাই বলা যায়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বহু সংকটের মধ্যে প্রধান সমস্যা হলো বিদ্যুৎ। বর্তমান এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছেÑআমাদের ব্যবহƒত এই বিদ্যুৎ অনবায়নযোগ্য শক্তি। পাশাপাশি বিদ্যুতের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারে সচেতনতার অভাবও অন্যতম কারণ। এই সংকটের সব থেকে প্রধান কারণ হলো উৎপাদনগত নানা ধরনের ত্রুটি। এই সংকট মোকাবিলা করতে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সরকার যতই পদক্ষেপ নিক না কেনো একটি দেশের প্রধান সম্পদ যেমন জনগণ তেমনি সম্পদ রক্ষার মূল হাতিয়ারও জনগণ। জনগণকেই তার দেশের অর্থনৈতিক এবং সার্বিক সংকটে পাশে থাকতে হবে। সহনশীল ও সৎ হয়ে দেশকে ভালোবেসে দেশের স্বার্থে প্রত্যেকটি জনগণ কাজ করলে কোনো সংকটই মোকাবিলা করা কঠিন হবে না। এই সংকটে রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের সব শ্রেণির মানুষের এগিয়ে আসা উচিত। দেশের প্রতিটি মানুষকে বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে আগ্রহ নিয়ে। রক্ষা করতে হবে দেশের এই মূল্যবান সম্পদকে এবং দেশকে এই সংকট থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিতে হবে প্রত্যেককে। একটু সচেতন হলে এবং নিজেদের সদিচ্ছা থাকলে আমরা খুব সহজেই প্রতিদিন খানিকটা হলেও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারি, যাতে দেশের এ সংকট কেটে যায়।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে আমাদের কিছু বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। এর মধ্যে একটি হলো অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করা। কোনো কাজে বাইরে গেলে মাঝে মধ্যেই আমাদের মধ্যে ঘরের সব সুইচ চালু রেখেই চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা পরিহার করতে হবে। একেকজন একেক রুমে বসে অবসর সময় কাটানোর চেয়ে এক রুমে বসে আড্ডা দিন। এতে অন্য রুমের বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে এবং পারিবারিক বন্ধনও বাড়বে। দিনের বেলায় আলো জ্বালিয়ে না রাখায় আমাদের সচেতন হতে হবে। ঘরে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক বা সূর্যের আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। সে ক্ষেত্রে সব দরজা-জানালা খোলা রাখলে এবং হালকা রঙের পর্দা ব্যবহার করতে পারলে এতে ঘরে তাপ হবে কম এবং সূর্যের আলোও আসবে। রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ফ্রিজারের তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখুন। রেফ্রিজারেটরের কয়েল পরিষ্কার রাখা উচিত। ফ্রিজে যাতে অতিরিক্ত বরফ না জমতে পারে তার জন্য কয়েকদিন পরপর ফ্রিজ পরিষ্কার করা উচিত। আমাদের পরিবারের রান্নার কাজে মাইক্রোওভেন এবং ওয়াশিং মেশিন ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধুয়ে ছাদে বা বারান্দায় শুকালে ড্রায়ারের জন্য বিদ্যুৎ খরচ হবে না। হেয়ার ড্রায়ার, ইলেকট্রিক রেজার, আয়রন মেশিন ইত্যাদি যন্ত্রে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। সুতরাং যতটা সম্ভব এগুলো ব্যবহার কম করুন। দিনে বার বার পোশাক ইস্ত্রি না করে একসঙ্গে প্রয়োজনীয় কাপড় ইস্ত্রি করে রাখলেই বারবার আয়রন মেশিনের বিদ–্যৎটা সাশ্রয় হয়। বাল্বের ক্ষেত্রে সাধারণ বাল্বের পরিবর্তে এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যবহার করলে ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। নিয়মিত বাল্ব পরিষ্কার রাখতে হবে। কিছু যন্ত্র আছে যেগুলো সুইচ বা রিমোট টিপে বন্ধ করার পরও বৈদ্যুতিক পাওয়ার চালু থাকে। তাই সেসব যন্ত্রের মাধ্যমে যাতে বিদ্যুৎ অপচয় না হয় সেজন্য ঘুমাতে যাওয়ার আগে যন্ত্রগুলো আনপ্লাগ করুন। কম্পিউটার ব্যবহারেও অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয় তাই অপ্রয়োজনে কম্পিউটার ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। কম্পিউটার সিøপিং মুডে রাখার ফলে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। কাজ শেষ হয়ে গেলে কম্পিউটার বন্ধ করে রাখুন। এসির ব্যবহার যথাসম্ভব কম করা উচিত। কেননা ফ্যানের চেয়ে এসি ব্যবহারে বিদ্যুৎ অপচয় বেশি হয়। এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা এর উপরে রাখা উচিত। রুম ঠাণ্ডা হয়ে গেলে এসি বন্ধ রাখতে হবে। জলের হিটারের তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি থেকে ৫০ ডিগ্রিতে কমিয়ে আনতে হবে, যার মাধ্যমে ১৮ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। তবে খুব দরকার না হলে হিটারের ব্যবহার পরিহার করা উচিত। বিভিন্ন উৎসব বা অনুষ্ঠানে যথাসম্ভব আলোকসজ্জা কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। টিফিন পিরিয়ডে সবার বাইরে যাওয়ার সময় ক্লাসের সব সুইচ বন্ধ রাখতে হবে। যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক নিশ্চিত করা সম্ভব সেখানে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করা উচিত। বিদ্যুৎ সংযোগ খারাপ বা ত্রুটিপূর্ণ হলে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হতে পারে, তাই নিয়মিত বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা করতে হবে। এসব বিষয় খেয়াল রেখে আমাদের একটু সচেতনতাই বিদ্যুতের খরচ অনেক কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে হয়। তাই আসুন দেশের এই সংকটে নিজে সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন করে গড়ে তুলি। বর্তমানে বিশ্বের প্রত্যেক দেশই নানা সমস্যার কবলে পরে কাবু হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও দারিদ্র্য বহুল রাষ্ট্রগুলোতে এর প্রভাব অতিমাত্রায়। তবে আমরা আশা করি, বাংলাদেশ এই সংকট কাটিয়ে উঠে কালো মেঘের ঘন ছায়া ছাড়িয়ে সূর্যের আলো ছড়াবে।
শিক্ষার্থী
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সিলেট