আমরা জাতি হিসেবে মুসলিম জাতি। সর্বকালের সর্বশেষ্ঠ মহামানব নবীকুলের শিরোমণি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত হিসেবে আমরাও সর্বকালের সব নবীদের উম্মত থেকে শ্রেষ্ঠ উম্মতের খ্যাতি অর্জন করেছি। অথচ আমরাই আমাদের দুনিয়াবি সামান্য স্বার্থের জন্য নিজের মধ্যে উগ্রতা প্রদর্শন, মারামারি-হানাহানি ও ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়ি। যেখানে বিনয়ী ও বিনম্র শব্দদ্বয়ের কোনো অবস্থান থাকে না।
সমাজের মধ্যে কোনো মানুষ যদি উগ্র স্বভাবকে লালন করে, তবে অন্য কোনো মানুষ তাকে পছন্দ করে না, তার সাহচর্য পেতে চায় না। তার অনুসরণ ও অনুকরণ করতেও চায় না। সমাজের সব মানুষের নিকটেই একজন উগ্র ও খারাপ স্বভাবের ব্যক্তি সর্বদা নিন্দিত হয়, প্রত্যাখ্যাত হয়। আর অন্যদিকে একজন বিনয়ী ও বিনম্র ব্যক্তি সবার নিকট প্রশংসিত হয়। সকলেই তার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে তৎপর থাকে, তাকে ভালোবাসে এবং সর্বদা তার সাহচর্য পেতে উৎসুক থাকে। এজন্য ইসলামে বিনয়ী ও বিনম্র হওয়ার বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে প্রত্যেক মুমিন-মুসলমান ওই স্বভাবকে ধারণ করে সমাজের সকলের নিকট উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে। যেরকম আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অনুকরণের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এখনও বিশ্বের কোটি কোটি মুমিন-মুসলমান তার অনুসরণ ও অনুকরণে সদা তৎপর।
আল্লাহ তায়ালা এই প্রসঙ্গে বলেন, তুমি তোমার অনুসারী বিশ্বাসীদের প্রতি সদয় হও। (সুরা শুআরা)। অন্যত্র বলেন, হে মানবজাতি, আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে যে অধিক আল্লাহভীরু সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ? মহাজ্ঞানী ও সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। (সুরা হুজুরাত)। আরও বলেন, তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। তিনিই সম্যক জানেন আল্লাহভীরু কে। (সুরা নাজ্ম)।
এ বিষয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ইয়াজ ইবনে হিমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার নিকট অহি পাঠালেন যে, তোমরা পরস্পরের সঙ্গে নম্র ব্যবহার অবলম্বন করো, যাতে কেউ যেন কারও প্রতি গর্ব না করে এবং কেউ যেন কারও প্রতি জুলুম না করে। (রিয়াদুস সালেহিন ৬০৭, মুসলিম ২৮৬৫, আবূ দাউদ ৪৮৯৫)।
আরও ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরাইরাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সাদকা করলে মাল কমে যায় না এবং ক্ষমা করলে আল্লাহ বান্দার সম্মান বাড়িয়ে দেন। আর যে কোনো ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে (মর্যাদায়) উচ্চ করেন।’ (রিয়াদুস সলেহিন ৬০৮, মুসলিম ২৫৮৮, তিরমিযী ২০২৯)।
সুতরাং এটা স্পষ্ট করে বলা যায়, বিনয়ী ও বিনম্র হওয়া একটি মহৎ গুণ। যারা নিজেদের মধ্যে এই গুণকে লালন করতে পারবে, ধারণ করতে পারবে, তারা দুনিয়াতে যেরকম সম্মান ও কল্যাণের অধিকারী হবে, সেরকম আখেরাতেও উত্তম প্রতিদানের দাবিদার হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে বিনয়ী ও বিনম্র মানুষের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। একজন সন্তান তার পিতা-মাতার প্রতি বিনয়ী হবে, এটাই ইসলাম শিক্ষা দেয়, অথচ দেখা যায় সমাজের অধিকাংশ সন্তান নিজেদের উগ্র স্বভাবের নিকট আত্মসমর্পণ করে পিতা-মাতার সঙ্গে উগ্র আচরণ করে। তাদের কষ্ট দেয়। একপর্যায়ে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। এছাড়া সমাজের যত মারামারি, হানাহানি, বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি মনুষ্য দ্বারা সৃষ্টি হয়, তার মূলে রয়েছে উগ্র স্বভাব। কারণ একজন বিনয়ী মানুষ কখনও অন্য মানুষের ক্ষতি করতে পারে না, তার অধিকার নষ্ট করতে পারে না, কোনো মানুষকে হেয় করতে পারে না।
অতএব সমাজের সকল স্তরের সকল মানুষকে বিনয়ী হতে হবে। একটা কথা মনে রাখা উচিত, বিনয়ী ও বিনম্র স্বভাব যার মধ্যে অনুপস্থিত থাকে, সে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হতে পারবে না। অবশ্যই এর জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতে হবে। তাই আসুন (প্রিয় নবী সা.-এর অনেক গুণ বা বৈশিষ্ট্যের একটি বিনয়ী হওয়া) এই গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে আমরা লালন করি, একটি শান্তিপূর্ণ ও পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা-সম্প্রীতির সমাজ গড়ি।
মেহেদী হাসান বিপ্লব
শিক্ষার্থী, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়