ফজলে এলাহী ফুয়াদ: দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অথবা সর্বশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কেই জানি আমরা। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে তৈরি করছে?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যথাযথ? অথবা আমাদের তরুণরা কি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ করে নিজেদের বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে? আমাদের তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করলেও দেশের চাকরির বাজারেই নিজেদের ধরে রাখতে পারছে না, তাহলে তারা বিদেশের কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে?
ফলে উচ্চশিক্ষা অথবা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শুধু বেকার তৈরির কারখানা হিসেবেই বিবেচিত হবে অদূর ভবিষ্যতে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে বাস্তবমুখী করার বিকল্প নেই।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা গবেষণানির্ভর নয়, এখানে শুধু নোট শিট ও ফটোকপি করা ছাড়া সে রকম শিক্ষা অর্জিত হয় না। প্রায়োগিক শিক্ষার বিকল্প কিছু আছে বলে মনে হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অ্যাসাইনমেন্ট হতে পারে সমস্যা সমাধান, সমস্যা অনুসন্ধান ও সমস্যার সমাধানের পদ্ধতি বের করা। এগুলোর মাধ্যমেই একটি সুশিক্ষিত দক্ষ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয় মানে যদি হয় বিশ্বের বিদ্যালয়, তাহলে এখানে কেন এত সীমাবদ্ধতাÑকেনইবা আমাদের তরুণদের বৈশ্বিকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ অথবা চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হতে পারে প্রায়োগিক জ্ঞানের অভাব, অথবা শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, যে শিক্ষায় বিশ্বের সঙ্গে তারতম্য রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই উপভোগ করার একটা জায়গাও বটে, তবে সেটা এমন যেন না হয়, যে তার জন্য আমাদের অনুশোচনা করতে হয়। যার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা, সেটা ঠিক রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটা জায়গা যেখান থেকে আমরা নিজেকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারব বলে বিশ্বাস করি। কিন্তু সেটা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে কতটা সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়।
তবুও স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা অচিরেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত হবে, তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের হার কমবে, বিশ্বের সব দেশে বড় পদে আসীন হবে আমাদের দেশের তরুণরা।
বাংলাদেশে বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্রছাত্রীর স্বাভাবিক বয়স তুলনা করলে ১৮ বয়সের সামান্য আগে বা পরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় সময়কে বিশ্ববিদ্যালয় সাফল্যের শক্তিতে পরিণত করতে পারছে না, যার নেতিবচক প্রভাব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে দেখতে পাই। সব শিক্ষার্থীর মেধা, সৃজনশীলতা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে ঝরে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ শিক্ষার্থীর ওপর অনুসন্ধান চালালে দেখা যায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার পূর্ব ব্যতীত সিলেবাস বা সিলেবাসের বাইরে তেমন কোনো পড়াশোনাই করে না। তারা অনেক বেশি বিনোদনমুখী এবং অপ্রয়োজনীয় কাজে তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় সময়কে নষ্ট করে। ১০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষার এক বা দুই মাস আগে থেকে সিলেবাসের পড়াশোনা করে এবং সারা বছরের বাকি সময় কাজে লাগার মতো তেমন কিছুই করে না। ১৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী দুই বা তিন মাস আগে থেকে সিলেবাসের ওপর পড়াশোনা করে। যদিও এক্ষেত্রে শুধু তাদের ফলাফল ভালো করার ইচ্ছাই প্রধান। আর বাকি ১৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী প্রায় সারাবছর স্যারদের কাছে ভালো হওয়ার জন্য, ভালো ফলাফল করার জন্য বা শিক্ষক হওয়ার জন্য সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশোনা করে। প্রত্যেক গ্রুপে শূন্য থেকে আট শতাংশ ব্যতিক্রম আছে, যারা সিলেবাসের পড়াশোনার সঙ্গে বাইরের সৃজনশীল কাজে নিজেকে জড়িত রাখে, সৃজনশীল চিন্তা এবং কাজ করার চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানসৃষ্টি, বিতরণ ও সমাজের কাজে লাগানোর কথা থাকলেও আমাদের জ্ঞান তৈরি করাও হয় না, আবার কাজের মূল্যবোধও তৈরি করা হয় না, যার ফলে সমাজে সম্ভাবনাগুলো কমে আসছে।
যে বয়সে আমাদের উদ্যোমী আরও পরিশ্রমী হওয়ার কথা, সে সময়টা আমরা বিশেষ কোনো কাজেই লাগাতে পারছি না। আমরা যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করি এবং তবে পাশ করে বের হওয়ার সময় পাহাড়সম হতাশা নিয়ে বের হই। সম্মান (অনার্স) পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সমাজের সবচেয়ে বেশি কাজে লাগতে পারে, কিন্তু সেই শক্তি কাজে না লাগানোর ফলে আমাদের সমাজে সম্ভবনাময় খাত নষ্ট হচ্ছে; নষ্ট হচ্ছে দেশের মূল্যবান সম্পদ।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হওয়ার কথা পাঠদান। এই পাঠদানের প্রক্রিয়াকে প্রায়োগিক জায়গায় সুসংহত করে গবেষণার পথ বের করে তা থেকে দেশের জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়