মেজবাহ হোসেন: বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল আকাক্সিক্ষত চাকরির নাম। বলা হয়ে থাকে, দেশের সর্বাপেক্ষা মেধাবীরাই এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসের একটি পদে নিয়োগ লাভ করে নিজের ও পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে সমর্থ হয়। কিন্তু একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম সারির ছাত্রছাত্রীরা বাস্তবিক অর্থে বিসিএস-সহ অন্যান্য সরকারি চাকরির ব্যাপারে বেশ অনীহ। বিষয়টা বুঝতে হলে কিছুটা বিশদ আলোচনা প্রয়োজন।
প্রথমত, একটি রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও তরুণদের মধ্যে ব্যাপক আকর্ষণীয় একটি চাকরির আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক (সম্মান) এবং শিক্ষাজীবনে একটি তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য কোন যুক্তিতে নির্ধারিত হতে পারে? দ্বিতীয়ত, এই পরীক্ষার (অবৈজ্ঞানিক) সিলেবাস কি প্রতিটি সেক্টরের মেধাবীদের যথাযথভাবে
মূল্যায়ন করতে সক্ষম? একজন পরীক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবনে কষ্টার্জিত বিষয়ভিত্তিক বিশেষ জ্ঞান ও ভালো ফলাফলের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা বা মূল্যায়ন পান না পরীক্ষাটির কোনো ধাপেই।
ধরা যাক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ৩.৭০ সিজিপিএ পেয়ে একজন স্নাতক সম্পন্ন করেছেন, অন্যদিকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একই বিভাগ থেকে ২.৭০ সিজিপিএ পেয়ে অপর একজন স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। উভয় প্রার্থীই সহকারী প্রকৌশলী (বিসিএস সিভিল) পদে আবেদনের জন্য সমানভাবে যোগ্য। এখন বুয়েটের সেই স্নাতক কি আবার চুয়েটের সেই স্নাতকের সঙ্গে শুরু থেকে প্রতিযোগিতা করবেন নিজেকে প্রমাণ করার জন্য? এটা কি যৌক্তিক বা আসলে হয়? বুয়েটের তিনি তো এরই মধ্যে তার মেধা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন ধাপে ধাপেÑবুয়েটে ভর্তির সুযোগ অর্জন, তারপর চার বছর নিরলস পরিশ্রম করে কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট, ল্যাব, মিডটার্ম ও ফাইনাল পরীক্ষা সব ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে যেহেতু তার থেকেও আরও ভালো রেজাল্টধারীরা (সিজিপিএ ৩.৮০/৩.৯০ বা তদূর্ধ্ব) লাইনে আছে, তাই বাধ্য হয়েই সেই স্নাতক (গণ) ইউরোপ বা আমেরিকায় পাড়ি জমানোটাই নিজের জন্য ইনসাফ মনে করেন, আর ছয় মাস/এক বছরের ব্যবধানে তিনি ইউরোপ বা আমেরিকায় নতুন স্বপ্নে নতুন উদ্যমে পথ চলা শুরু করেন। তাহলে আমাদের এই বিসিএস (বা অন্য চাকরি) পদ্ধতি কি মেধা পাচারকে উৎসাহিত করছে না বা প্রকৃত মেধাবীদের কি আমরা দেশ ছাড়তে বাধ্যই করছি না? যিনি একজন সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অধিকারী, তাকে বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা, সাধারন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো বিষয়ে বাহুল্য প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে তার কাছে যদি আমরা আরও উচ্চতর শিক্ষা চাইতাম (অবশ্যই চাকরিতে প্রবেশের পর) তাহলে তিনি কি উৎসাহিত বোধ করতেন না এবং জাতি হিসেবে আমরা ওই পদে অধিকতর অভিজ্ঞ, জ্ঞানী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একজন কর্মকর্তা পেতাম না? একজন যোগ্য ব্যক্তির নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ, মূল্যবোধ, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সাহস একজন অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য ব্যক্তির থেকে অনেক অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে আমাদের মতো একটি দুর্নীতিপ্রবণ রাষ্ট্রে একজন যোগ্য কর্মকর্তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান নিতে পারতেন। অনুরূপ তুলনা চুয়েটের একজন ৩.৭০ সিজিপিএ পাওয়া স্নাতক ও বুয়েটের একজন ২.৭০ সিজিপিএ পাওয়া স্নাতকের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
এবার শিক্ষা ক্যাডারের দিকে তাকালে অনুরূপ চিত্রই লক্ষণীয়। বর্তমানে আমাদের দেশে যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সিজিপিএ ৩.৫০ ও তদূর্ধ্ব পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা পর্যাপ্ত, সেখানে কেন আমরা সিজিপিএ ২.৫০ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ডেকে আনছি সরকারি কলেজগুলোয় শিক্ষকতার জন্য? কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভালো শিক্ষার্থী তার বিভাগেরই একজন পড়ালেখায় অমনোযোগী ও দুর্বল রেজাল্টধারী সহপাঠীর সঙ্গে অন্তত শিক্ষা ক্যাডারের পদে প্রতিযোগিতা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না। ফলে দেখা যাচ্ছে শিক্ষা ক্যাডারে আমরা এমন প্রার্থীকে নিয়োগ দিচ্ছি, যাদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষ জ্ঞান, দক্ষতা, শিক্ষকতায় আগ্রহ বা দরদ কোনোটিই নেইÑশুধু যেন চাকরি করার জন্য করা। এর কারণ সেই একই, মোট এক হাজার ৩০০ নম্বরের (প্রিলি-সহ) পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিক ২০০ নম্বরে মোটামুটি পাশ নম্বর তুলে জেনারেল অংশে ভালো করলেই শিক্ষায় নিয়োগ পাওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিভাগের ও ব্যাচের একজন সহপাঠীকে জানি, যে পরীক্ষায় নকল করায় বেশ সিদ্ধহস্ত ছিল এবং নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ে একাধিকবার পরীক্ষা থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছিল। বর্তমানে সে শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত শুধু প্রচলিত বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতির বদৌলতে। আবার আমার সাত-আট সহপাঠী যাদের একাডেমিক প্রোফাইল অনেক ভালো, শিক্ষকতায় সুযোগ পেলে তারা ভালো শিক্ষক হতে পারত; কিন্তু শুধু সিস্টেমের ত্রুটির কারণে তারা আর শিক্ষকতায় আগ্রহ দেখায়নি। একটি উপযোগী ও কার্যকর পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হলে সরকারি কলেজগুলোয়ও বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষক পাওয়া যেত এবং শিক্ষার মান উন্নত হতো। কৃষি কর্মকর্তাদের বেলাতেও বিষয়টি হুবহু একই, তবে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিষয়টি একটু ভিন্ন হলেও ওই একই কায়দায় ডাক্তার নিয়োগের কোনো যুক্তি নেই।
এত কিছুর পর অনেকটা স্বস্তির বিষয় হলো বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষা পদ্ধতি। এখানে যেহেতু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রার্থীরাই অংশগ্রহণ করে, তাই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় তাদের স্ট্যান্ডার্ড অনুসারেই প্রশ্ন করা হয় (বিসিএসের মতো নয়)। লিখিত পরীক্ষায় এক হাজার নম্বরের মধ্যে ৬০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয় আইনের বিষয়ে এবং এবং বাকি ৪০০ নম্বরের পরীক্ষা হয় সাধারণ বাংলা (১০০), সাধারণ ইংরেজি (১০০), বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয় (৫০+৫০) এবং সাধারণ গণিত ও দৈনন্দিন বিজ্ঞান (৫০+৫০) বিষয়ে। আমার মতে, বাংলা ও ইংরেজিতে যদি ১০০-এর পরিবর্তে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়া হতো, অর্থাৎ জেনারেল বিষয়ে ৩০০ নম্বর এবং আইন বিষয়ে ৭০০ নম্বরের পরীক্ষা হলে বিজেএস পরীক্ষা সর্বোৎকৃষ্ট মানের পরীক্ষাগুলোর মধ্যে একটি হতো (তবে বর্তমান পদ্ধতিটিও বেশ ভালো)।
তো বিজেএসের আলোকে প্রফেশনাল ক্যাডার পদগুলোয় নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ প্রফেশনাল সার্ভিস (বিপিএস বা এ-জাতীয় কিছু) কেন গঠন করা হয়নি? এরকম একটি পৃথক কমিশন গঠন করে যদি শুধু প্রফেশনাল পদগুলোর জন্য ১০০ নম্বরের প্রিলি, নিজ নিজ বিষয়ের ওপর ৪০০-৫০০ নম্বরের ও সাধারণ বিষয়গুলোয় ২০০-৩০০ নম্বরের লিখিত ও ২০০ নম্বরের ভাইভা পরীক্ষা নেয়া হলে নিশ্চিতভাবেই প্রকৃত মেধাবীরাই রাষ্ট্রসেবায় আসার সুযোগ পেত। এখানে ভাইভা পরীক্ষায় ২০০ নম্বর রাখার কারণ হলো অধিকতর যোগ্য প্রার্থীদের আরও এক দফা স্বীকৃতি প্রদান, যেমনÑমৌলিক বিষয়ের কোনো প্রার্থীর যদি দু-একটি জার্নাল পাবলিকেশন থাকে বা বাংলার কোনো প্রার্থীর গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা নাটক প্রকাশিত হয়ে থাকে, তবে তারা যেন সেগুলোর মান অনুযায়ী অনায়াসে ১৮০-১৯০ নম্বর পেতে পারে। এরকম একটি পদ্ধতিতে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে সিজিপিএ ৩.২৫ (৪.০০ স্কেলে, বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ৩.৫০ চাইলেও সমস্যা ছিল না) চাওয়া যেত এবং সাধারণ এক বছরের মাস্টার্স ডিগ্রির পরিবর্তে দুই বছরের এমফিল ডিগ্রির কথাও ভাবা যেত; তবে অবশ্যই তাদের বেতনকাঠামো বিজেএসের অনুরূপ কিছু একটা করতেই হবে (প্রারম্ভিক মূল বেতন ৩০ হাজার ৯৩৫ টাকা, যা ক্যাডার পদের থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি)। এই অতিরিক্ত বেতন হওয়ার বেশকিছু কারণ আছে। প্রথমত, প্রফেশনাল সেবাগুলো উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু জেনারেল সেবাগুলো অনুৎপাদনশীল। দ্বিতীয়ত, তাদের কাছে যেহেতু অতিরিক্ত যোগ্যতা চাওয়া হবে, তাই তাদের বেতনও বেশি। তৃতীয়ত, বিসিএসে পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কর বা আনসার পদগুলো বেশ অভিজাত ধাঁচের এবং পেশাগত কারণেই তারা অনেক বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই এসবের বিপরীতে প্রফেশনাল পদগুলোয় কিছুটা বাড়তি বেতন-ভাতা দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা, যেন একজন চাকরিপ্রার্থীর সামনে দুটি সমমানের বিকল্প থাকে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা, আন্তঃপেশা বৈষম্য ও দ্বন্দ্ব^ নিরসন করাও সম্ভব হবে। এছাড়া যেসব প্রার্থী উচ্চতর ডিগ্রি, যেমন পিএইচডি বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন (ডাক্তারদের ক্ষেত্রে) সম্পন্ন করে চাকরিতে আসতে চাইবে, তাদের জন্য ছোট পরিসরে একটি লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভা নিয়ে এক ধাপ ওপরের পদে সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা রাখাও খুবই যুক্তিযুক্ত।
যে কথাটি আমাদের ভাবনাতেই আসে না, সেটা হলো একজন চাকরিপ্রার্থীর একটি ভালো চাকরি যতটা না প্রয়োজন, তার থেকেও একটি রাষ্ট্রের একজন সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা অনেক বেশি প্রয়োজন; কারণ ওই কর্মকর্তার দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছরের চাকরিজীবনের ভালো বা মন্দ কাজই ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের চরিত্র গঠন করবে। তাই শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটু যুগোপযোগী ও যৌক্তিক সংস্কার করা গেলে যে কতটা সমৃদ্ধিশালী একটি পেশাজীবী সমাজ গড়ে উঠবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতার মতোই পেশা গ্রহণের এককেন্দ্রিকতাও খুবই মারাত্মক। এই উভয়টির প্রভাবেই অনুর্বর ও বন্ধ্যা সমাজ গড়ে ওঠে। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের যত বেশি পেশা গ্রহণের স্বাধীনতা ও সুযোগ দেয় (মানে যার যেটা পছন্দ বা প্রয়োজন তাকে সেভাবেই বিকশিত হওয়ার ব্যবস্থা করা), সেই রাষ্ট্র তত বেশি বৈচিত্র্যময়, উন্নত ও সমৃদ্ধ।
শিক্ষক, রসায়ন বিভাগ
হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
(বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত)