শামসুন নাহার ও তৌহিদুর রহমান: বর্তমান বিশ্বের রাজনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত আলোচিত একটি বিষয় ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ’, যাকে ইংরেজিতে ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে এখন উত্তেজনা তুঙ্গে। বলা যায়, বিশ্বব্যাপী এক ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দুই দেশÑযুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বিশ্ব রাজনীতিতেও এখন বেশ সক্রিয়ভাবে ছড়ি ঘোরাচ্ছে দেশ দুটি। ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ’ নিয়েই তাদের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।
‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’ নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদের বিষয়টি আলোচনার আগে এটি আসলে কী, সে বিষয়ে একটু আলোচনা করে নেওয়া যাক। সাধারণ কথায়, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বলতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মস্তিষ্কপ্রসূত জ্ঞান থেকে উদ্ভাবিত নতুন কোনো কিছুকেই বোঝানো হয়। এ উদ্ভাবন থেকে পরবর্তী সময়ে কপিরাইট, পেটেন্ট বা ট্রেডমার্কের মাধ্যমে এক ধরনের মালিকানা স্বত্ব তৈরি করা হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের কপিরাইট যতক্ষণ পর্যন্ত উদ্ভাবনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়ত্তে বা অধিকারে থাকে, ততক্ষণ কেউ ওই সম্পদটি ব্যবহার করতে চাইলে উদ্ভাবনকারীর অনুমতি নিতে হয়। অধিকার স্বত্ব কিনে নেওয়া বা বিনিময়ের মাধ্যমেও তা করা যায়।
নতুন কোনো উদ্ভাবনের স্বত্ব সংরক্ষণের বিষয়টি ঠিক কখন শুরু হয়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস জানা যায় না। তবে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে ছাপাখানার কার্যক্রম ব্যাপক আকারে শুরুর পর মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ওই সময়ে বিভিন্ন উদ্ভাবনী বিষয়বস্তু বিশেষ করে নানা ধরনের সাহিত্যকর্মের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের মানচিত্র, শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট নতুন নতুন আবিষ্কার ও প্রযুক্তি, ভবন ও শিল্পকারখানার নকশা প্রভৃতির মতো বিষয়গুলো কপিরাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন হওয়া শুরু হয়।
বর্তমান বিশ্বে কপিরাইট, ট্রেডমার্ক নিবন্ধন বা পেটেন্টের মতো বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। এমনকি অধিকাংশ দেশে অনেক প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বিভিন্ন বিষয়েরও ভৌগোলিক পেটেন্ট নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে নতুন নতুন উদ্ভাবিত বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি পণ্যেরও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এ-সংক্রান্ত অত্যন্ত কঠোর ও কার্যকর আইন রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো কিছু বৈশ্বিক সংস্থায়ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ-সংক্রান্ত শক্তিশালী আইন রয়েছে।
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় মনোযোগের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ পরিস্থিতি। এর সূচনা মূলত ওই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’ নিয়েই। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে, চীন তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছেÑযার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য। তবে চীনের পক্ষ থেকে তা বরাবরই অস্বীকার করা হচ্ছে। বরং এমন অভিযোগের মাধ্যমে চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে দেশটি। এটি নিয়েই বিশ্ববাণিজ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। আর এই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’ চুরির বিষয়টি এখন বিশ্ববাণিজ্য বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চ্যালেঞ্জের নতুন ক্ষেত্র হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।
চীনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির অভিযোগ বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরিবিষয়ক কমিশন ২০১৭ সালে এক প্রতিবেদনে বলেছে, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির কারণে দেশটির কোম্পানিগুলো প্রতিবছর ২২ হাজার ৫০০ থেকে ৬০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর এই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির দায়ে সবচেয়ে বড় তীর চীনের দিকে তাক করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এ আলোচনায় আরও গতি এসেছে। তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীনের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান, যার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে গত মার্চ থেকে। চীনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে আমদানির ক্ষেত্রে ইস্পাত পণ্যে ২৫ শতাংশ ও অ্যালুমিনিয়ামে ১০ শতাংশ হারে শুল্কারোপ করেন। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে চীনের রফতানি বাণিজ্যে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের ফলেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ারও শঙ্কাও দেখা দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ১২৮টি মার্কিন পণ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্কারোপ করে চীন। পরবর্তী সময়ে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে এক হাজার ৩০০ চীনা পণ্যে পাঁচ হাজার ডলারের শুল্কারোপের কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্র। এর পরই সয়াবিন, এয়ারক্রাফটের যন্ত্রাংশ, কমলালেবুর রসসহ ১০৬টি মার্কিন রফতানি পণ্যে চীন পাঁচ হাজার কোটি ডলারের শুল্কারোপ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।
শুধু এভাবে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপেই থেমে নেই বিষয়টি। উভয় দেশের শীর্ষনেতারাও জড়িয়েছেন কথার লড়াইয়ে। হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন আরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার। সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ দুটির এ লড়াইয়ে এখন বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বন্দ্বে বিশ্বের অনেক দেশ এখন বড় ক্ষতিতে পড়ার আশঙ্কা করছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও ইইউর মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোও বাণিজ্যযুদ্ধের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে।
যদিও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির বিষয়ে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, আরও অনেক দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির অভিযোগ রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে প্রযুক্তি পণ্যের তৈরি পদ্ধতি হাতিয়ে নিয়ে তা নতুন করে তৈরি করে আসছে দেশটি। চীনের সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের একটি বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রযুক্তি নকল করে তৈরি করা বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া চীনের নকল পণ্যে এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের বাজারই সয়লাব হয়ে গেছে। শুধু প্রযুক্তি পণ্যই নয়, আরও অনেক ধরনের পণ্যই চীন নকল করছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আবার চীন বাদেও অনেক দেশের বিরুদ্ধে এভাবে পণ্য নকলের অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরির বিষয়টি কীভাবে দেখা হয়, সে প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি রোধে কপিরাইট আইন রয়েছে। এছাড়া আরও নানাভাবে, টাস্ক ফোর্স গঠন করে নকল করার প্রবণতা রোধ করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তারপরও এটি কতটা রোধ করা যাচ্ছে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। প্রায়ই চলচ্চিত্র, নাটকসহ এ ধরনের সম্পদ পাইরেসি ও মেধাস্বত্ব চুরির খবর পাওয়া যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট নকল তো নৈমিত্তিক ঘটনা। অ্যাকাডেমিক পেপার প্রকাশনায়ও হাস্যকর রকমের চুরির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহিত্যের ধারণা ও অংশবিশেষ চুরি করে বাংলায় বই ছাপানোসহ নানাভাবে কপিরাইট আইন লঙ্ঘনের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এছাড়া চীনা নকল পণ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলতে গেলে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকার নিয়ে আমাদের দেশে যথেষ্ট সচেতনতার অনেক অভাব রয়েছে। অনেকেই এ ব্যাপার সম্পর্কে অবগত নন। আবার অনেক লেখাপড়া জানা ব্যক্তিও ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন না। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ আইন লঙ্ঘন করার ফল যে কত জটিল হতে পারে চীন-মার্কিন পরিস্থিতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বড় কোনো জটিলতা বা বিবাদ শুরু হলে তার প্রভাব কমবেশি সব দেশের ওপরেই পড়ে। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ নিয়ে চীন-মার্কিন জটিলতায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু আমাদের দেশে ছোট পরিসরেও যাতে এ আইন লঙ্ঘন না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার এখনই চূড়ান্ত সময়। চীন-মার্কিন বাণিজ্য জটিলতার কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকারের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাই নিজের জায়গা থেকে সজাগ হতে হবে বাংলাদেশকেও।
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ নিয়ে এত আলোচনা, বিবাদ ও জটিলতার মধ্যেও অনেকেই এ ব্যাপারটিকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চান। তাদের মতে, ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ’ কথাটি একটি গালভরা শব্দগুচ্ছ ছাড়া কিছুই নয়। এ নিয়ে কোনো স্বত্বাধিকার দাবি বা অধিকারের বিষয়টিকে হীন মানসিকতার পরিচায়ক বলতে দ্বিধাবোধ করেন না অনেক বুদ্ধিজীবী। তাদের কথা অবশ্য একেবারে যুক্তিহীন নয়, কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বলতে মূলত চর্চার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও উদ্ভাবনকে বোঝায়। আর জ্ঞান বা উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যই মানুষের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়া। জ্ঞান তো কারও কুক্ষিগত করে রাখার মতো বস্তু নয়। তাছাড়া ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’ কথাটার মধ্যে প্রোপার্টি শব্দটিই যত গোলযোগের মূলে। জ্ঞানকে আমরা সম্পদ বলতে পারি বটে, কিন্তু ‘প্রোপার্টি’ শব্দটি মূলত বস্তুগত সম্পত্তিকে বোঝায়। সব ধরনের বস্তুগত সম্পত্তির নির্দিষ্ট মালিকানা স্বত্ব থাকে। শব্দটির সঙ্গে আইনি ব্যাপারও জড়িত হয়ে পড়ে। ঠিক সে অর্থে জ্ঞানের মালিকানা স্বত্ব থাকা সম্ভব নয়, কারণ মৌলিক জ্ঞান ব্যাপারটি অবাস্তব। একজন বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক বা গবেষকের চর্চা, গবেষণা ও উপলব্ধির মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানের মধ্যেও উপকরণ হিসেবে থাকে পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক লাখো মানুষের জ্ঞান, অবদান ও উদ্ভাবন। এসবের সমন্বয়েই আকার পায় নতুন জ্ঞান বা উপলব্ধি। তাই অনেকে মনে করেন, কোনো আবিষ্কার বা উদ্ভাবনকে একটা দীর্ঘসময় পর্যন্ত অধিকার স্বত্বের বেড়াজালে আটকে ফেলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশকে কুক্ষিগত করে রাখাটা অযৌক্তিক। জ্ঞানকে চুক্তি, আইন বা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বেঁধে ফেলা হীনমন্যতারই নামান্তর।
জ্ঞান ও প্রযুক্তি সামনের দিকে প্রবাহিত হবে ও ছড়িয়ে পড়বে এটিই স্বাভাবিক। তাহলে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকারের মতো জটিল শব্দমালা তৈরি করে এত বিবাদের সূত্রপাত কেন? উত্তর হলো, প্রাথমিকভাবে এর সঙ্গে নৈতিকতার বিষয়টিও জড়িত। একজন লেখক নিশ্চয়ই চাইবেন না তার লেখা বই বা এর অংশবিশেষ হুবহু নকল করে এবং তাকে উল্লেখ না করে অন্য কেউ বই প্রকাশ করুক। কিংবা একটি কোম্পানি থেকে কোনো পণ্যের ফরমুলা অনৈতিকভাবে সংগ্রহ করে এবং তা কাজে লাগিয়ে পণ্য উৎপাদন করাটাও মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু সমাজে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এজন্যই ষাটের দশকে বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংস্থা গড়ে তোলা হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি পরে একটি জাতিসংঘ সংস্থার মর্যাদা লাভ করে। এ কর্তৃপক্ষই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ নিয়ে ব্যাপক কাজ করে চলেছে। কিন্তু ব্যাপারটি কেবল নৈতিকতা ও নিয়ম মেনে চলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, একটা পর্যায়ে আর্থিক লাভ-ক্ষতির ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকারের প্রসঙ্গটি।
আমরা একজন লেখকের লেখা পড়তে পারি, তা নিয়ে আলোচনা করতে পারি তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু লেখকের অবদান উল্লেখ না করে নিজের লেখায় তা যুক্ত করে প্রকাশ করলে সেটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। কারণ বই প্রকাশের সঙ্গে আর্থিক প্রাপ্তি জড়িত। একইভাবে একটি বিদেশি পণ্য, হতে পারে সেটি একটি খেলনা, তা আপনি কিনতেই পারেন। খেলনাটির অংশগুলো খুলে এর মেকানিজম শিখে নিতে পারেন, এমনকি নকল করে একই রকম আরেকটি বানাতেও পারেন। কিন্তু এমন খেলনা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বানিয়ে অর্থ উপার্জন করলে তা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকারের লঙ্ঘন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ায় কোনো বাধা আসলে নেই। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ আইন হয়তো সেভাবে জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আটকে রাখছে না। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিধিবদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জ্ঞানের হস্তান্তর নিশ্চিত করা। এতে মনোপলি ও ব্রেইন ড্রেইনের সম্ভাবনা বাড়ে সন্দেহ নেই। আর্থিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতার জোরে মেধা পুঞ্জীভূত করে উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও জ্ঞানে আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে; আবার চাইলেই লালিত জ্ঞানকে আটকে রেখে বাকি বিশ্বকে বঞ্চিত করতে পারে। তার পরও বলতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ আইন জ্ঞানকে আটকে রাখে না। ক্ষমতাসীন দেশগুলোর সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার মানসিকতাই জ্ঞানের সুফল থেকে পুরো পৃথিবীকে বঞ্চিত করছে, সৃষ্টি করছে জটিলতা।
লেখকদ্বয় গণমাধ্যমকর্মী
rakhy09@gmail.com
touhiddu.rahman1@gmail.com
