নিজস্ব প্রতিবেদক: গত কয়েক বছরে বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ব্যাপকহারে বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১৬ কোটি ডলার। ক্রমবর্ধমান এ ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অডিটরিয়ামে ‘প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ অব শর্ট টার্ম ফরেন কারেন্সি ফিন্যান্সিং অব ব্যাংকস’ শীর্ষক কর্মশালায় এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিবের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি টিম গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে ২০১২ সালে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের পরিমাণ ১৫৮ কোটি ডলার। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৮ কোটি ডলারে। সর্বশেষ হিসেবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১৬ কোটি ডলার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যদি ক্রমবর্ধমান স্বল্পমেয়াদি ঋণের লাগাম এখনই টেনে ধরা না হয় তবে দিনে দিনে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় রকমের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ইতোমধ্যে এ ধরনের ঋণের দ্বারা অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য ঋণগ্রহীতাদের তথ্য যাচাইয়ের ব্যাপারে আরও কঠোর হতে হবে। এছাড়া অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেন বিদেশে কোনোভাবেই টাকা পাচার না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান তার বক্তব্যে বলেন, দেশের মধ্যে যখন উচ্চ সুদহার ছিল তখন বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ নেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়। সেই সময়ে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার ছিল ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ। এখন তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বর্তমানে বিদেশি ঋণের সঙ্গে দেশি ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহারের তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সবসময় উৎসাহিত করে। কিন্তু দেশের তুলনামূলক কম সুদহারের আশায় যখন তখন বিদেশি ঋণের অনুমোদন দেওয়া হবে না। কেননা, পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশ বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে। এজন্য বিষয়টি নিয়ে ভাববার প্রয়োজন রয়েছে।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরী বলেন, স্বলমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের ভালো দিকের পাশাপাশি বেশকিছু ঝুঁকিও রয়েছে। আমরা যদি বৈশ্বিক চিন্তা করি, তাহলে আগে যতোগুলো ফাইন্যানশিয়াল ক্রাইসিস হয়েছে সেখানে দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদি ঋণ কম খরচে বড় করা হয়। বড় করে যখন ফিরিয়ে দেয়ার সময় হতো তখন যদি লোকাল কারেন্সি অবমূল্যায়ন করে তখন ব্যালেন্স অব পেমেন্টে সমস্যা দেখা দেয়। তাই আমাদের যেন এ ধরণের সমস্যায় না পড়তে হয় সেজন্যই আজকের এই কর্মশালা।
তিনি আরো বলেন, অফশোর ব্যাংকিংয়ের সোর্সেস অব ফান্ডের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে সবসময় মনিটরিং করা উচিত। প্রত্যেকটি ব্যাংকের ফরেন কারেন্সির দায় বেড়ে যাচ্ছে। যদিও ক্রাইসিস সেশন এখনো টাচ করেনি। কিন্তু, ক্রাইসিস সেশন টাচ করার পর কি আমরা পদক্ষেপ নেবো, নাকি তার আগেই আমরা ব্যাংকগুলোকে নিবৃত করবো যাতে ক্রাইসিস সেশন পর্যন্ত না যেতে পারে। আমরা চাচ্ছি একটা শক্ত মনিটরিং ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নিয়ে অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ধরনের ঋণে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে সেসব ঝুঁকি রয়েছে তা নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিলাসবহুল সব পণ্যের জন্য ইউপাসিং ফাইন্যান্সিং বন্ধ রাখতে হবে। এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে সঠিক তদারকি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ডেটা অ্যানালাইসিস করে ব্যাংক প্রধানদের একটা প্রাসঙ্গিক কাঠামো গঠন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে এ বছর মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশের কমে রাখার যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সেটা এ ধরনের ফাইন্যান্সিং বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেন তিনি।
কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের অনুষদ সদস্য সৈয়দ মোহাম্মদ বারিকুল্লাহ, ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুব উল আলম, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আহমেদ শাহিন প্রমুখ।




