মাসুম বিল্লাহ ও জয়নাল আবেদিন: দেশে উম্মুক্ত বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা চালু থাকাকালীন ব্যাংক ঋণের সুদ প্রায় সর্বদাই ছিল দুই অঙ্কের ঘরে। অনেক ক্ষেত্রে এ সুদ হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যেত বলে ব্যবসায়ীরা নানা সময় অভিযোগ করতেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কম সুদের বিদেশি ঋণের দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কারণ বিদেশি ঋণের সুদহার অনেক কম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে টাকার বিপরীতে ডলার শক্তিশালী হওয়ায় বিদেশি ঋণের সুদ প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। অন্যদিকে বর্তমানে দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে দেয়া হয়েছে। ফলে যারা সস্তা উৎস হিসেবে বিদেশ থেকে নিয়েছিল, তারা এখন বিপাকে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১১ মাসের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারে দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এরসঙ্গে লন্ডন ইন্টার-ব্যাংক অফার্ড রেট (লাইবর) ও অন্যান্য পরিষেবা মিলে প্রায় ১৪ শতাংশ সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে দেশি গ্রাহকদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৯ জুন ৯২ টাকা ৮৩ পয়সায় বিক্রি হয়েছে প্রতি ডলার। ২০২১ সালের ৩ আগস্ট প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। সুতরাং মাত্র ১১ মাসের ব্যবধানে ৮ টাকা ০৩ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে ডলারের মূল্য। শতাংশীয় হিসাবে যা ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এভাবে ডলার শক্তিশালী হতে থাকায় বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন ঋণগ্রহীতারা।
২০২১ সালের ডিসেম্বর নাগাদ দেশে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। করোনা মহামারির দুই বছরেই বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ যুক্ত হয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। আর সর্বশেষ পাঁচ বছরে এ ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের হিসাব সম্পন্ন হলে এ ঋণ ২৫ বিলিয়ন ডলারে ঠেকবে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেশি সুদ দিতে হয় বিধায় এক সময় ভালো উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকতে থাকেন। আর ভালো উদ্যোক্তা ছাড়া বিদেশি ঋৎস থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব নয়। কেননা বিদেশি উৎস থেকে ঋণ পেতে হলে নানা ধরনের শর্ত পূরণ করতে হয়। কয়েক বছর আগেও বিদেশি এসব ঋণের সুদ ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে লাইবর হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণ অন্যান্য সার্ভিস চার্জ এবং হঠাৎ করে বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি এসব ঋণের সুদ সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে এক সময়ের সস্তা সুদের এসব ঋণ দেশের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারও বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছে। গত ডিসেম্বর শেষেই সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হিসাব হালনাগাদ করা হলে এটি এখন প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত ডলারের সংস্থান করা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ঋণ যেখান থেকেই নেয়া হোক না কেন, ঋণ মানেই ঝুঁকি। বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সরকার উভয়ের জন্যই বিষয়টি প্রযোজ্য। যাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নেই, তাদের কোনোভাবেই বৈদেশিক ঋণ নেয়ার অনুমতি দেয়া ঠিক না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে। সবাই শুধু স্বল্প সুদের ঋণ খোঁজে। কিন্তু অন্যান্য ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করে না।
তিনি আরও বলেন, দেশের বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনও খুব বেশি নয়। যারা বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছেন তাদের বলতে চাই, তারা যেন দেশি উৎস থেকে ঋণ নেন। কারণ দেশেরও অর্থের প্রয়োজন আছে। আর এসব ঋণের অর্থ ফেরত দিতে না পারলে বিশ্বের বুকে দেশের বদনাম হয়।
করোনা মহামারি শুরুর পর দেশে বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২০ সালেই বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে এসে এ ঋণের পরিমাণ ২৩ দশমিক শূন্য সাত বিলিয়ন (দুই হাজার ৩০৭ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যায়। বেসরকারি খাতে বিদেশি এ ঋণের মধ্যে ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ডলার স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যা মোট ঋণের ৬৭ শতাংশ। আর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৭৬১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার।
করোনাসৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময়ে উন্নত দেশ ও বহুজাতিক সংস্থাগুলোয়ছ বিনিয়োগযোগ্য অলস তারল্যের পাহাড় গড়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে লাইবর নেমে আসে ইতিহাসের সর্বনি¤েœ। এর সুবাদে দেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সুদেই বিদেশি ঋণ নিতে পেরেছে। তবে ২০২১ সালের শুরু থেকে লাইবরের সুদহার ঊর্ধ্বমুখী। চলতি সপ্তাহে এক বছর মেয়াদি লাইবর সুদহার ছিল ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ছয় মাস মেয়াদি লাইবর ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং এক মাসের কম মেয়াদ লাইবর ১ দশমিক ৫১ শতাংশে নির্ধারিত হয়েছে। লাইবরের নি¤œ সুদহারকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি বড় শিল্পোদ্যোক্তারা কমিশন, ফিসহ ৫ শতাংশ সুদে বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে পারছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে হঠাৎ করে বিনিময় হার বেড়ে যাওয়া ও ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোদের জন্য বাড়তি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের। ডলারের বিনিময় হার হিসাব করলে বর্তমানে বিদেশি ঋণসেবা হার প্রায় ১৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ প্রবাহের প্রধান মাধ্যম দেশে কার্যতর ব্যাংকগুলোর অফশোর ইউনিট। দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমে আছে ৩৬টি। এছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (বিডা) অন্যান্য কিছু মাধ্যমেও বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বিতরণ হয়।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক (ডিজি) আখতারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো অনেক বড় পর্যায়ে চলে যাবে। জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চাইনা খুব দ্রুত এগোচ্ছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে আমাদেরও বৈদেশিক ঋণের সক্ষমতা ও ট্র্যাক রেকর্ড থাকা প্রয়োজন। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে এসব ট্র্যাক রেকর্ডকে বিদেশিরা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বিবেচনা করবেন। সুতরাং এটার প্রয়োজন আছে। তাছাড়া বৈদেশিক ঋণ এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি।




