ব্যবসা ও শেয়ার লেনদেন চালুর উদ্যোগ ঢাকা ফিশারিজের

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের পুঁজিবাজারে ১৯৯৬ সালে তালিকাভুক্ত হয় খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি ঢাকা ফিশারিজ লিমিটেড। দীর্ঘদিন ব্যবসা করার পর ২০০৯ সালে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (সাবেক এমডি) কারসাজির কারণে বন্ধ হয়ে যায় কোম্পানিটি। তাদের হারাতে হয় গাজীপুরে অবস্থিত একমাত্র মাছের খামার; ফলে প্রতিষ্ঠানটি নামমাত্র চালু থাকলেও বন্ধ থাকে ব্যবসা। এতে ধীরে ধীরে কোম্পানির পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয়াসহ বার্ষিক সাধারণ সভাও (এজিএম) বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে ২০১০ সালের ধসের পর শেয়ারটিকে আর ইলেকট্রনিক শেয়ার করা হয় না এবং দীর্ঘদিন ব্যবসা, লভ্যাংশ বা এজিএম না থাকায় কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজারের ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে পাঠানো হয়। তবে প্রায় এক যুগ বন্ধ থাকার পর পুনরায় ব্যবসা ও এসএমই প্ল্যাটফর্মে শেয়ার লেনদেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটি। ওটিসি মার্কেটের কোম্পানিগুলোকে কার্যক্রমে নিয়ে আসার বিষয়ে বিএসইসির উদ্যোগের ফলে কোম্পানিটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে বিএসইসির সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও কোম্পানি বেশ কয়েকটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে।

বিনিয়োগকারীরা বিষয়টিকে আশানুরূপ বলে জানিয়েছেন। কোম্পানির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও বিএসইসির উদ্যোগের ফলে কোম্পানিটি যেন পুনরায় ব্যবসা ও শেয়ার লেনদেন শুরু করে এবং সঠিক নজরদারির মাধ্যমে তাদের স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে দাবি তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে আর কেউ কারসাজি করে কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করতে না পারে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এজন্য যথাযথ সব পদক্ষেপ যেন নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়ে জানান তারা।

তথ্য মতে, সাবেক এমডি এনসিসি ব্যাংকের দায় পরিশোধের কারণ দেখিয়ে কোম্পানির ১০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাছের খামার ও জমি মাত্র ২৫ কোটি টাকায় বিক্রি করেন। সে কারণে জমিটি নিলামে তুলে ব্যাংক ও ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি একটি পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়। কিন্তু কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়নি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি)। পরে নিলামে জমি বিক্রি করে ১৮ কোটি টাকা দায় সমন্বয় করে ব্যাংক এবং বাকি ৭ কোটি টাকা কোম্পানির নামে একটি ‘সুন্ড্রি’ ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়। সেই টাকাও আত্মসাতের জন্য পাঁয়তারা করেন সাবেক এমডি। এজন্য তিনি কোর্টের কাছে একটি আবেদনও করেন তখন। কিন্তু কোম্পানির বর্তমান পরিচালক মো. ফকরুল আলমের পক্ষ থেকে রিট আবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি বাতিল করানো হয়।

জানা যায়, সে সময় সাবেক এমডি নিজের স্ত্রীর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বর্তমান পরিচালক মো. ফকরুল আলমের কাছে গোপনে তার সব শেয়ার বিক্রি করে দেন। কিন্তু এ বিষয়েও তিনি ডিএসই বা বিএসইসিকে সে সময় কোনো তথ্য জানাননি। আর ফকরুল আলমের কাছে শেয়ার বিক্রির পর তিনি কোম্পানির জমিটি গোপনে বিক্রি করে দেন। যে কারণে বর্তমান পরিচালক ফকরুল আলম এনসিসি ব্যাংকে থাকা কোম্পানির সাত কোটি টাকা সংগ্রহ করেননি এবং ব্যাংকের টাকার জন্য সাবেক এমডির পাঁয়তারা নষ্ট করে পরবর্তীকালে জমি বিক্রির বিষয়টি বাতিল করার জন্য কোর্টে আবেদন করেন। মামলাটি এখনও কোর্টে চলমান বলে কোম্পানি জানিয়েছে।

এদিকে কোম্পানির হাতছাড়া হয়ে যাওয়া জমি পরে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) জন্য সরকার অধিগ্রহণ করে। সেই জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকায় এখনও অধিগ্রহণের অর্থ কাউকে দেয়া হয়নি। একদিকে এনসিসি ব্যাংকের নিলামের মাধ্যমে পাওয়া কোম্পানির সেই জমির বর্তমান মালিকানায় রয়েছে মেরিন রিসোর্ট নামের একটি কোম্পানি।

অপরদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত থাকায় পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের অনুমতি না নিয়ে জমি বিক্রির বিষয়টি বাতিল করার চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান পর্ষদ। ফলে জমি বিক্রির বিষয়টি বাতিল হলে অধিগ্রহণের টাকা পাবে কোম্পানি।

এ বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুস শাদাত শেয়ার বিজকে বলেন, এক বছর আগে কোম্পানির শেয়ার নিয়ে এমডি হয়েছি। কোম্পানির পুনরায় ব্যবসা ও শেয়ার চালুর কার্যক্রম চলমান। এজন্য ইতোমধ্যে বিএসইসির সঙ্গে আমাদের বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। এছাড়া আমরা শেরপুরে একটা প্রজেক্ট নিয়েছি, যেটার কাজ চলছে। আশা করছি, আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে প্রজেক্টটি চালু হবে। সেই সঙ্গে কোর্ট থেকে আমাদের বাকি থাকা সব এজিএম মার্চের মধ্যে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। সেটা শিগগিরই সম্পন্ন করা হবে বলে জানান তিনি।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে একাধিক শেয়ারহোল্ডারের সঙ্গে কথা হলে তারা কোম্পানিটির ব্যবসা ও শেয়ার লেনদেন চালু নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং আর যেন আগের মতো কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য প্রতিনিয়ত নজরদারি ও সুশাসন নিশ্চিতের দাবি করেন।

এ বিষয়ে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার এএফএম রফিকুজ্জামান জানান, কোম্পানির শেয়ার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছি। কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো কাজ হয়নি। তবে সম্প্রতি শুনেছি শেয়ার লেনদেন ও ব্যবসা চালুর বিষয়ে বিএসইসির সঙ্গে কোম্পানির বৈঠক হয়েছে এবং সে বিষয়ে কাজ চলছে। যদি এরকমটা হয়, তবে আমরা আশাবাদী ভালো কিছু হবে। সেই সঙ্গে আর যেন আগের এমডির মতো কেউ কারসাজি করতে না পারে এবং কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে বিএসইসির নিয়মিত নজরদারির দাবি জানাচ্ছি।