অনিরীক্ষিত তৃতীয় প্রান্তিক প্রতিবেদন

ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রেনাটা, মুনাফায় বড় ধাক্কা

রাহমান আরিফ : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ খাতের কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডের আয় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি বেড়েছে। কিন্তু আয় বাড়লেও কোম্পানিটির মুনাফা বাড়েনি, বরং উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ৩৫ শতাংশ বা প্রায় ৯০ কোটি টাকা কমেছে। তৃতীয় প্রান্তিক শেষে কর-পরবর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেও প্রায় একই চিত্র দৃশ্যমান। এ সময়ে রেনাটার আয় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এর বিপরীতে কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। কোম্পানিটির তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। পিছিয়ে পড়ার জন্য বাড়তি উৎপাদন খরচ, ঋণের সুদ ও বিক্রয়-বিপণন ব্যয়কে দায়ী করছেন রেনাটার দায়িত্বশীলরা। মুনাফার ধারা অব্যাহত রাখতে দাম সমন্বয়ের বিষয়েও ভাবছে কোম্পানিটি।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ৯ মাসে রেনাটা প্রায় তিন হাজার ১৩৩ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। এর আগের আর্থিক বছরের একই সময়ে কোম্পানিটি উৎপাদিত ওষুধ বিক্রি করে প্রায় দুই হাজার ৭৮১ কোটি টাকা আয় করেছিল। এ হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে রেনাটার আয় বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।

আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে প্রায় এক হাজার ৬৫ কোটি টাকা আয় করেছে রেনাটা। এর আগের আর্থিক বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় ছিল প্রায় ৯২১ কোটি টাকা। এ হিসেবে প্রথম প্রান্তিকে রেনাটার আয় প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে প্রথম প্রান্তিকে কর-পরবর্তী মুনাফা দেখিয়েছে ৫৬ কোটি টাকা। এর আগের আর্থিক বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে প্রায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ।

তথ্যমতে, রেনাটার আয় বাড়লেও মুনাফায় পিছিয়েছে কোম্পানিটি। তৃতীয় প্রান্তিক শেষে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ১৬৮ কোটি ১৯ লাখ টাকায় নেমেছে, যা এর আগের আর্থিক বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ২৫৮ কোটি সাত লাখ টাকা। এ হিসেবে কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে প্রায় ৩৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।

আয়-মুনাফা বিপরীত চিত্রের জন্য বাড়তি উৎপাদন খরচকে দায়ী করছে কোম্পানিটি। চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে রেনাটার উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, যা এর আগের আর্থিক বছরের একই সময়ে ছিল এক হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন খরচ ২১ শতাংশ বা ৩১৪ কোটি টাকা বেড়েছে। একইভাবে পণ্য বিপণন, সরবরাহ ও ব্যাংকঋণের সুদের পেছনে খরচও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

চলতি আর্থিক বছরের প্রথম নয় মাসে পণ্য বিক্রি ও সরবরাহ খাতে রেনাটা ব্যয় করেছে ৮৩৪ কোটি টাকা, যা এর আগের আর্থিক বছরের একই সময়ে ৭০৯ কোটি টাকা ছিল। এ খাতের ব্যয় ১৮ শতাংশ বা ১২৫ কোটি টাকা বেড়েছে। আর চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে রেনাটার সুদ বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১২৫ কোটি টাকা, যা এর আগের আর্থিক বছরের একই সময়ে ছিল ৮০ কোটি টাকা। এ খাতের ব্যয়ও ৫৬ শতাংশের বেশি বা ৪৫ কোটি টাকা বেড়েছে।

রেনাটার দায়িত্বশীলরা বলছেন, পণ্য উৎপাদন, বিক্রি, বিপণন ও ব্যাংকঋণের সুদের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। যে কারণে চলতি আর্থিক বছরে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেনি কোম্পানিটি। আয়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও মুনাফায় পিছিয়েছে রেনাটা।

রেনাটার কোম্পানি সচিব জুবায়ের আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চলতি আর্থিক বছরেও আয়ের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে, কোম্পানির আয় বাড়ছে। কিন্তু উৎপাদন ও বিপণনসহ কয়েকটি খাতের ব্যয় বেড়েছে। তাই তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ৯ মাসে কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে। এ অবস্থায় মুনাফার ধারা অব্যাহত রাখতে হলে ওষুধের দাম সমন্বয় করার কোনো বিকল্প নেই।’

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে রেনাটা প্রায় এক হাজার ৬৫ কোটি টাকা আয় করেছে। এ সময়ে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে ৯২১ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে রেনাটার কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল প্রায় ৭২ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, দেশের পুঁজিবাজারে বেশ পুরোনো কোম্পানি রেনাটা লিমিটেড। ১৯৭৯ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি। বর্তমানে ২৮৫ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে ৩৬১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করেছে রেনাটা। মুনাফার প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিনিয়োগকারীদের ৯২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি। প্রায় এক বছর ধরে রেনাটার শেয়ারদর আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল এক হাজার ২১৭ টাকা ৯০ পয়সা। আর সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল প্রতিটি শেয়ার ৪৯১ টাকায় লেনদেন হয়েছে। এ সময়ে শেয়ারদর প্রায় ৭২৭ টাকা বা ৫৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছে।