ব্যাংক পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে

রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘নবম বার্ষিক ব্যাংকিং কনফারেন্স’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শনিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, পরিচালকরা হস্তক্ষেপ করলে ব্যাংকের ক্ষতি হবে। ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কাজ সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী তারা কাজ করবেন। পরিচালকরা ব্যবস্থাপনার কাজ করবেন না। এর আগে দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করে গভর্নর জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো পরিচালক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবৈধ হস্তক্ষেপ করলে তাকে জানাতে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওই এমডিকে সুরক্ষা দেবে বলেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রায়ই শোনা যায়, কারণে-অকারণে পরিচালকরা ব্যাংকারদের কাজে হস্তক্ষেপ করেন। ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে। বিশেষ করে পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এমডি ও ডিএমডি) স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে নাÑএ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বক্তব্য সময়োপযোগী বলেই আমরা মনে করি।

ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। এখন এ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুশাসনের অভাব। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংক খাতে সুশাসন বলতে কিছু নেই। ব্যাংক খাতের জন্য যে নীতিমালা, আইন-কানুন, আন্তর্জাতিক রীতি আছে আমাদের দেশে যথাযথ অনুসৃত হয় না। এটি স্বীকার করতেই হবে। সুশাসন ছাড়া কোনো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সার্বিক নির্দেশনা দেবে এবং তারা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজ হবে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কার্যপরিধি আইনে বলা আছে। অথচ প্রায়ই শোনা যায়, পরিচালনা পর্ষদ  ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করে।

পরিচালনা পর্ষদ নীতিগত সিদ্ধান্ত দেয়ার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেন বেশি। ফলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। তারা পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পরিচালকদের সাময়িক উদ্দেশ্য হাসিল হলেও মূলত ব্যাংকেরই ক্ষতি হয়।

পরিচালনা পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ করার প্রবণতা যেমন কাম্য নয়Ñতেমনই নিয়মনীতির ব্যত্যয় সাধনে পারস্পরিক যোগসাজশে অপ্রত্যাশিত। ফলে জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ গৌণ হয়ে পড়ে। খেলাপি ঋণ আদায় করা যায় না, গ্রাহক ও শেয়ার শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা হারায় ব্যাংক।

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক বা চেয়ারম্যান হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব স্বার্থ কিংবা নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে। অনেক সময় আত্মীয়স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা দেয়ার জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিয়ে থাকেন তারা। এমনকি নিজস্ব লোকদের ঋণ প্রদানের জন্য তারা ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে থাকবেন কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের সন্তুষ্ট করার ওপর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দক্ষতা এবং  কর্মক্ষমতার ওপর তার টিকে থাকা না-থাকা তেমন একটা নির্ভর করে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিবিড় তদারকি ছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয়। যেহেতু গভর্নর নিজেই এ বিষয়টি সামনে এনেছেন, তাই আশা করা যায় পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ থামাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাও তৎপর থাকবে।