আতাউর রহমান:ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিনিয়োগকারী এবং বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি আল-হাজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. বখতিয়ার রহমান। তিনি কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন ও পর্ষদের শেয়ারধারণ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, যা আইনের লঙ্ঘন। সেই সঙ্গে কোম্পানির দেয়া তথ্য যাচাই না করে তা প্রকাশ করেছে স্টক এক্সচেঞ্জ। তাই ভুয়া তথ্য দিয়ে প্রতারণায় কোম্পানিটির এমডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে তথ্য যাচাই না করে প্রকাশের কারণে স্টক এক্সচেঞ্জের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সম্প্রতি বিএসইসির কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তথ্যমতে, আল-হাজ টেক্সটাইলের এমডি কোম্পানি সম্পর্কে যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা বিভ্রান্তিকর এবং এতে তিনি বেশ কিছু আইন লঙ্ঘন করেছেন। এছাড়া কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ সভায় কোম্পানির পরিচালক নন, বাইরের এমন এক ব্যক্তির সামনে অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে তিনি আলোচনা করেন বলে জানা যায়। একই সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জকে তিনি কোম্পানির বোর্ড মিটিং এবং মাসিক শেয়ারধারণের বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। এদিকে শেয়ারধারণ-সংক্রান্ত নথিতে কোম্পানি সচিবের স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও সেগুলোয় স্বাক্ষর করেছেন তিনি নিজে। এতে তিনি কোম্পানির তথ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছেন বলে মনে করে বিএসইসি। যে কারণে কোম্পানিটির পর্ষদে আবার নতুন করে দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক মনোনীত করতে চায় কমিশন।
এর আগে কমিশন কোম্পানিটির পাঁচ স্বতন্ত্র পরিচালকের মধ্যে তিনজনকে অপসারণ করে। এর মধ্যে বিএসইসির সাবেক কমিশনার খন্দকার কামালুজ্জামানসহ অপসারিত অপর দুই স্বতন্ত্র পরিচালক হলেন এমডি জিকরুল হক ও এএফএম আবদুল মঈন। এছাড়া কোম্পানিটির স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ তারিকুজ্জামান এবং নোভারটিস বাংলাদেশের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার ফাহমিদ ওয়াসিক আলীকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
কোম্পানির অন্য দুই স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটসের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি মেম্বার মো. সেলিম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন খান।
উদ্যোক্তা পরিবারের পরিচালকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলাকালে খন্দকার কামালুজ্জামানের সভাপতিত্বে কোম্পানির পর্ষদ চলতি বছরের শুরুতে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিতে আলোচনায় বসে। সেখানে ঋণদাতার সঙ্গে কতটা দর কষাকষি বা সমোঝোতা করতে হবে এবং কোম্পানির ব্যাবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত আরও অনেক বিষয় নিয়ে তারা বিভক্ত হয়। পরে যে কারণে এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অন্যদিকে আল-হাজ টেক্সটাইলের ঋণের বিষয়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে কোম্পানিটির ঋণদাতা অগ্রণী ব্যাংক, যা নিয়ে কোম্পানিটি বছরের পর বছর ধরে মামলা লড়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের কারণে কাঁচামাল আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে পারছে না কোম্পানিটি। এসব জটিলতার কারণে কোম্পানিটির সম্পদ বেশি থাকলেও ব্যবসায় লোকসান বা স্বল্প মুনাফার দিকে টেনে নিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে কোম্পানিটির এমডির সঙ্গে শেয়ার বিজ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থ বলে জানান এবং কোম্পানি সচিব মো. সেলিম পারভেজের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে কোম্পানির সচিবকে ফোন করা হলে প্রথমে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেয়া হলে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর দেননি।
এর আগে কোম্পানিটির পর্ষদে গত বছরের অক্টোবরে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে বিএসইসির সাবেক কমিশনার এবং সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার কামালুজ্জামানকে মনোনীত করা হয়। তারও আগে ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি বিএসইসির মনোনীত চারজন পরিচালক আল-হাজ টেক্সটাইল মিলসে পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের যোগ দেন। স্বতন্ত্র পরিচালকরা হলেনÑবাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যপক ড. এএফএম আব্দুল মঈন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাইফুদ্দিন খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) সহযোগী অধ্যাপক মিলিতা মেহজাবিন। তখন স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. শফিকুল ইসলাম ছিলেন। পরে পরিবর্তন করে বিএসইসির কমিশনারকে দেয়া হয়।
১৯৮৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আল-হাজ টেক্সটাইলের অবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরে নাজুক। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির পর্ষদ পুনর্গঠন করে বিএসইসি। কিন্তু উদ্যোক্তা-শেয়ারহোল্ডারদের দ্বন্দ্বের কারণে এ পর্ষদও ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে বিএসইসি আবার পর্ষদ পুনর্গঠন করে।