Print Date & Time : 30 August 2025 Saturday 5:52 pm

ভোক্তার ওপর অযৌক্তিক বোঝা চাপিয়েছে পিডিবি

নিজস্ব প্রতিবেদক: সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অযৌক্তিকভাবে ভোক্তার ওপর দায় চাপিয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পরিপালন ও ভর্তুকি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এটিকে দাম বৃদ্ধি না বলে দাম সমন্বয় হিসেবে মন্তব্য করেছে সরকার। কিন্তু বর্ধিত দামের বোঝা ভোক্তার ওপর না চাপিয়ে বিকল্প উপায়েও ভর্তুকি সমন্বয়ের সুযোগ ছিল।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় ‘সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি: ভর্তুকি সমন্বয়ের অন্য বিকল্প আছে কী?’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন তিনি। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি, মাশফিক আহসান হƒদয় ও প্রোগ্রাম সহযোগী ফয়সাল কাইয়ুম।

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রক্রিয়াগত ত্রুটিসহ এ খাতে ভুলনীতিসহ নানা কারণে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ভর্তুকি বাড়ছে, যার দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করছে সরকার। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। অথচ মূল্যবৃদ্ধি না করে অনেক বিকল্প ছিল।’

তিনি বলেন, সরকার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে এটিকে সমন্বয় বলছে। বাস্তবতা হলো এটি মূল্যবৃদ্ধি। ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে এই মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার। এর ফলে ভোক্তার ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের কারণে এভাবে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হচ্ছে। অযৌক্তিক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সমন্বয় করা গেলে বিদ্যুতের মূল্য এভাবে বৃদ্ধির দরকার হতো না। এটা সরকারের প্রথম অগ্রাধিকারে থাকা দরকার। কিন্তু সরকার ধাপে ধাপে আরও মূল্যবৃদ্ধির কথা বলছে। সেটা হলে ভোক্তার জন্য আরও বড় নাভিশ্বাস তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মোয়াজ্জেম বলেন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) পাশ কাটিয়ে সরকারের নির্বাহী আদেশে মূল্য বৃদ্ধির কারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাগুলো আস্তে আস্তে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২২ সালে বিইআরসির আইন সংশোধন করে সংস্থাটির যে কর্তৃত্ব খর্ব করা হয়েছে, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি। এক্ষেত্রে আইনের সংশোধনী বাতিল করে বিইআরসিকেই বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে মূল কর্তৃত্ব প্রদানের প্রস্তাব দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের পাশাপাশি বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা, এলএনজি ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝোঁক এবং বিদ্যুৎ কেনায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের অভাব। জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২০১০ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোকে অবারিত মুনাফা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এক্ষেত্রে নতুন করে যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যতীত কোনো ক্যাপাসিটি পেমেন্ট প্রদান-সংক্রান্ত চুক্তি করা না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, সর্বশেষ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি পরিবারে মাসিক ব্যয় গড়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ, ব্যবসা ও অফিসে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, শিল্পে ১০ শতাংশ এবং সেচে ১১ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে। পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও এর সঙ্গে বেড়েছে। তিনি বলেন, বর্ধিত দামের কারণে শীতে গড়ে একটি খানাকে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আর গরমকালে ১১৮ টাকা বাড়তি বিল দিতে হবে।

কোন প্রেক্ষাপটে সরকার মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিলÑসম্মেলনে সে প্রশ্নও রেখেছে সিপিডি। আইএমএফের পরামর্শে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর কথা বলে সরকার যেভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে, এটার প্রয়োজনই পড়বে না। সরকার যদি এই চার পদক্ষেপ নেয় বিদ্যুৎ খাতে, তাহলে ২০২৯ সাল থেকে আর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিতে হবে না। এই চারটি বিকল্প হলোÑসময়মতো বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা, বেসরকারি খাতে নতুন বিদ্যুৎ কিনতে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ শর্তে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রয়োজনে খুবই সামান্য পরিমাণে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা। এগুলো বাস্তবায়ন করলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাতে আর ভর্তুকির প্রয়োজন পড়বে না বলে মনে করে সিপিডি।