রেজাউল করিম খোকন
[গতকালের পর]
মধ্যম আয়ের দেশগুলোর উচ্চ আয়ের পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য যে নীতিমালা প্রয়োজন, তা প্রণয়ন করা দুষ্কর। বিশেষত প্রতিটি দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার স্বাতন্ত্র্য এ কাজটিকে আরও কঠিন করে তোলে। অর্থনীতিবিদদের দেখানো বিভিন্ন প্রমাণ অনুযায়ী, নিরবচ্ছিন্ন উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনামূলক অল্প সময়ের ব্যবধানে আয়সীমায় দুইবার সফল উত্তরণের অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টি নিশ্চিত বলে প্রতীয়মান হয়। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন সতর্কবার্তা এখন অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ছে। বর্তমান মন্দা পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা এবং ২০৩১ ও ২০৪১ সালের মধ্যে যথাক্রমে উচ্চ-মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নের পেছনে ছোটার রাস্তায় অবিচল থাকার জন্য বাংলাদেশকে এখন তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন সংকট সমাধানের জন্য সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বানই রয়েছে ওইসব সতর্কতবার্তায়। এ স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশের সামনে এখনও অসংখ্য বাধা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তারপরও এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব যদি দেশের অর্থনৈতিক খাতকে খোলনলচে বদলানো ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে খারাপ প্রভাবের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনার প্রবল ইচ্ছা থাকে। কিন্তু সবার আগে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে সৃষ্ট বর্তমান ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে।
সাম্প্রতিক কয়েক দশকে দেশের অর্থনীতি বর্তমান সময়ের মতো কঠিন পরিস্থিতির মাধ্যমে যায়নি, ফলে এর আগে কখনো সংস্কারে প্রয়োজনীয়তাও এত বেশি জরুরি মনে হয়নি। অর্থনৈতিক খাতে, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ঘুষের মচ্ছব থাকলেও করোনা মহামারির আগে গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির দারুণ প্রবৃদ্ধি ঘটছিল। ওই দশকটি ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কিছু বৃহৎ আর্থিক কেলেঙ্কারির মিশ্র দশক। কিন্তু এ সময়ে এসে অনেক কিছুই বদলে গেছে। মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দ্বৈত ধাক্কা দেশের অর্থনীতির দুর্বলতাগুলোকে উš§ুক্ত করে দিয়েছে। এসব ধাক্কার কারণে বাংলাদেশ এখন বিশাল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও ব্যালান্স অব পেমেন্টের চাপের সঙ্গে লড়াই করছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যাপ্ত রাখার জন্য সরকারকে আমদানির ওপর বিধিনিষেধ জারি করতে হয়েছে। ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ নামক নতুন একটি বৃহৎ গ্রাম উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ, কিন্তু এর অগ্রগতি এখন পর্যন্ত কিছু পাইলট উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অর্থনৈতিক খাতে সুশাসন ও মান উন্নয়নে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই কর্তৃপক্ষকে সংস্কারের কথা বলছেন। সরকারের এজেন্ডায় সংস্কার উদ্যোগ মাঝেমধ্যে ছিল, তবে তা কখনোই অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল না। বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে জরুরি ঋণ নিচ্ছে, অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে বিশ্বব্যাংকের কাছে আরও তহবিল চাইছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে: আর্থিক ব্যবস্থায় সংস্কার। সম্প্রতি দুটো পৃথক সফরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশকে রাজস্ব-নীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কর প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন। মানবপুঁজিতে সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। তাই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতসহ বিভিন্ন সামাজিক খাতের উন্নয়নে অনেক কাজ করতে হবে। কম সরকারি বিনিয়োগের ফলে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকছে। দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য অনেক বেশি। সরকারের উচিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মান নিশ্চিতে বাজেটে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমাতে এবং মানবসম্পদ ও পুষ্টি সূচকগুলোর মান বাড়াতে বাজেটারি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে প্রস্তুত বাংলাদেশের এসব সমস্যার সমাধান করা দরকার। বিশ্বব্যাংক এখন বলছে, মাথাপিছু জিডিপি ১৩ হাজার ২০০ ডলার হলেই চলবে না, ক্রয়ক্ষমতাও আমেরিকার তুলনায় ৫ শতাংশ থেকে ৪৩ শতাংশের মধ্যে হতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চলমান মন্দা কাটিয়ে উঠতে হবে এবং মহামারিপূর্ব প্রবৃদ্ধিতে ফিরে যেতে হবে। মহামারির আগে বেশ কয়েক বছর এ প্রবৃদ্ধি গড়ে ৭ শতাংশ ছিল। করোনা হানা দেয়ার আগের বছরে তো প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ অতিক্রম করেছিল। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে পরের পাঁচ বছরে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছার স্বপ্ন দেখছে। নি¤œ-মধ্যম আয় থেকে সফলভাবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের কাতারে পৌঁছানো সম্ভব হলে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোর বছরের পর বছর আটকে থাকা মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বেরোতে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কাজটি ভীষণ কঠিন, আর সময়টাও স্বল্প। [শেষ]
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক




