Print Date & Time : 20 April 2026 Monday 10:48 pm

মহাসড়কে অটোরিকশা: শৃঙ্খলার অভাব নাকি বাস্তবতার চাহিদা?

আসাদুল্লাহ গালিভ আল সাদি: বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতের উন্নতি সত্ত্বেও, মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল একটি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এবং সমাধান-অপেক্ষিত সমস্যা। ঢাকা এবং অন্যান্য প্রধান শহরের মহাসড়কে অটোরিকশার চলাচল কেবল যানজট ও দুর্ঘটনার কারণই নয়, এটি সড়ক ব্যবস্থাপনার অদক্ষতারও পরিচায়ক। রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অবৈধ। এর আগে ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন দফা অটোরিকশা বন্ধে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এছাড়া অটোরিকশার আমদানি বন্ধেরও নির্দেশ দেন আদালত। এ আদেশ বহাল রেখে আপিল বিভাগও পরে দেশের সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
অটোরিকশা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, মহাসড়কে এ যানবাহনের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি অনেক প্রশ্নের জš§ দেয়। এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে এর পেছনের কারণ, এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সম্ভাব্য সমাধানগুলোর দিকে গভীরভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মতো ব্যস্ত রুটগুলোয় প্রতিদিন অটোরিকশার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। স্থানীয় যাত্রীরা অল্প খরচে যাতায়াতের জন্য অটোরিকশাকে বেছে নিলেও, এটি দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। ধীরগতির এ যানবাহন মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি করে এবং প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়।
বিরল নয় এমন চিত্র দেখা যায়, যেখানে দ্রুতগামী বাস বা ট্রাক অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে। মহাসড়কে অটোরিকশার উপস্থিতি আইনত নিষিদ্ধ হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রশাসনের দুর্বলতা ও পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থার অভাবের কারণে অব্যাহত থাকে। গত ১৬ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অটোরিকশা-ড্রাম ট্রাকের সংঘর্ষে ২ নিহত হয়েছেন। ১৭ নভেম্বর রাজধানীর পল্টন মোড়ে বাস-ট্রাক ও অটোরিকশার ত্রিমুখী সংঘর্ষে ব্যাংক কর্মকর্তা জাকির হোসেন (৬০) নিহত হয়েছেন। ১৯ নভেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় নিহত হয়েছেন বিপণন বিভাগের শিক্ষার্থী বিভাগের শিক্ষার্থী আফসানা করিম রাচি। সেই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা।

মহাসড়কে অটোরিকশার প্রভাব যানজট ও সময় নষ্ট: অটোরিকশার গতি সাধারণত ঘণ্টায় ২০-৩০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মহাসড়কে অন্যান্য দ্রুতগামী যানবাহনের তুলনায় এটি একটি বড় প্রতিবন্ধক। ধীরগতির কারণে অটোরিকশা যানজট সৃষ্টি করে, যা শুধু ব্যক্তিগত সময় নষ্ট নয় বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতাতেও প্রভাব ফেলে।
সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি: মহাসড়কে দ্রুতগামী যানবাহন যেমন বাস, ট্রাক ও প্রাইভেটকারের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষ প্রায়ই ঘটে। এ সংঘর্ষের কারণে যাত্রী ও চালক গুরুতর আহত হন বা প্রাণ হারান। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মহাসড়কে দুর্ঘটনার বড় একটি অংশের জন্য অটোরিকশা দায়ী।
অর্থনৈতিক প্রভাব: মহাসড়কে যানজট এবং দুর্ঘটনার ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। পণ্য পরিবহন বিলম্বিত হলে ব্যবসায়িক ক্ষতি হয় এবং মানুষের কাজের সময় নষ্ট হয়।
পরিবেশগত প্রভাব: যানজটের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে; যার ফলে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। যদিও অটোরিকশা তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব, এর অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কেন অটোরিকশা মহাসড়কে প্রবেশ করে?

অর্থনৈতিক কারণ: অটোরিকশা চালকদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। গ্রাম বা শহরতলির যাত্রীর চাহিদা পূরণে তারা মহাসড়ক ব্যবহার করেন। যাত্রীদের কাছ থেকে অল্প ভাড়া পেলেও, এটি তাদের জন্য টিকে থাকার একটি প্রধান মাধ্যম।
আইন প্রয়োগের দুর্বলতা: মহাসড়কে অটোরিকশার প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও, প্রশাসনের দুর্বলতা এবং ট্রাফিক পুলিশের অমনোযোগিতার কারণে এটি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে, স্থানীয় প্রশাসন আর্থিক সুবিধার জন্য এদের চলাচল সহ্য করে। সম্প্রতি ২০ নভেম্বর বুধবার রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশের প্রতিবাদে বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন অটোরিকশা চালকরা। এতে দুজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
বিকল্প ব্যবস্থা নেই: শহরাঞ্চল এবং শহরতলির মধ্যে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাস বা ট্রেন সেবা নেই। ফলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে অটোরিকশার ওপর নির্ভর করেন।
সমস্যা সমাধানের উপায়
মহাসড়কে অটোরিকশার চলাচল বন্ধ করতে হলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা: শহর ও শহরতলির মধ্যে বাস সেবা উন্নত করতে হবে। কম খরচে ট্রেন সেবা চালু করতে হবে। মহাসড়কে স্থানীয় যাত্রী পরিবহনের জন্য বিশেষ মাইক্রোবাস (ট্যাক্সি) বা মিনিবাস সেবা চালু করতে হবে।
আইন প্রয়োগের কঠোরতা বৃদ্ধি: মহাসড়কে অটোরিকশার প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি বাড়ানো উচিত। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নির্দিষ্ট লেনের ব্যবস্থা: যেখানে সম্ভব, সেখানে অটোরিকশার জন্য আলাদা লেন তৈরি করা। যদিও এটি বাস্তবায়ন কঠিন, তবে নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোয় এটি কার্যকর হতে পারে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: চালক ও যাত্রী উভয়ের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। ট্রাফিক নিয়ম ভাঙার ঝুঁকি এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে প্রচার চালানো।

বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি: অটোরিকশা চালকদের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা। এটি তাদের মহাসড়কে প্রবেশের প্রবণতা কমাতে সহায়তা
করবে।
ইতিবাচক দিক: অটোরিকশা বাংলাদেশের পরিবহন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শহরের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এছাড়া এটি পরিবেশবান্ধব এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। তবে এর সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করলে অটোরিকশা দেশের পরিবহন খাতের উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল বাংলাদেশের একটি চলমান সমস্যা, যা সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিকল্প ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মহাসড়কে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কমানো সম্ভব। অটোরিকশার মতো একটি সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য পরিবহন ব্যবস্থা যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে এটি দেশের পরিবহন খাতের উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।