এস এম রুবেল, কক্সবাজার: বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী। অথচ সেই দ্বীপেই চলছে নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বনবিভাগের ভূমিকা নিষ্ক্রিয়। মাঝে মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালতে পাহাড় খেকোদের শাস্তির আওতায় আনলেও জরিমানা দিয়ে তারা বের হয়ে যায় এবং আবারও পাহাড় কাটা শুরু করে।
এদিকে মহেশখালীতে হঠাৎ করেই পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। তাদের প্রথম অভিযানে পাহাড় কাটার সময় পাঁচটি ডাম্পার গাড়ি ও পাহাড় কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গত শনিবার চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
শুক্রবার রাত ৯টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত টানা ৬ ঘণ্টাব্যাপী মহেশখালী থানা পুলিশ উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের বারঘর পাড়ার আবদুল আলীর ঘোনায় এ অভিযান চালায়।
আসামিরা হলেন ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের দক্ষিণকুল গ্রামেন মৃত শামসুল ইসলামের পুত্র জাহেদ সিকদার (৩০), মহেশখালী পৌরসভার পালপাড়া গ্রামের মৃত সুভাষ পালের পুত্র স্বপন পাল (৪৫), ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের নলবিলা গ্রামের আবুল হাশেম প্রকাশ সুইননার পুত্র সরোয়ার (৩৮) এবং পানিরছড়া ইউনিয়নের পানিরছড়া জৈয়ারকাটা গ্রামের মৃত রশিদ আলীর পুত্র সেলিম প্রকাশ সল্লু (৩০)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড় কাটার অভিযোগে পুলিশের করা মামলায় ওই চারজন আসামি চিহ্নিত পাহাড় ও বনকাটা চক্রের দলনেতা। তাদের হাত ধরেই মহেশখালীর পাহাড় নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে। প্রশাসন বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতে পাহাড় ও বন খেকোদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি পাহাড় কাটার সরঞ্জাম আটক করলেও কিছুদিনের মধ্যে তা ছাড়া পেয়ে এসব পুনরায় পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত হয়।
থানা সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হোয়ানকের পাহাড়ি এলাকায় ওসি প্রণব চৌধুরীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম অভিযান চালায়। পুলিশ গোরকঘাটা জনতাবাজার প্রধান সড়ক থেকে পূর্ব পাশে প্রায় এক কিলোমিটার পাহাড়ের ভিতরে পৌঁছালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ৫টি ডাম্পার গাড়ি ও পাহাড় কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম রেখে পালিয়ে যায় পাহাড় খেকোরা। এ সময় গাড়ি ও সরঞ্জামগুলো জব্দ করে পুলিশ।
এ বিষয়ে মহেশখালী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী জানিয়েছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে পাহাড় ও বনায়ন রক্ষা করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। যারা এসব ধ্বংসের কাজে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর ১৫ এবং বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর ১৫ ধারায় জড়িত ৪ জন ও অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে বনবিভাগের লোকদের সঙ্গে সমন্বয় করে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে পাহাড় খেকো চক্রের সদস্যরা। বিগত কয়েকদিনের মধ্যে চক্রটি প্রায় ৫০ ফুটের একটি পাহাড় কেটে বন উজাড় করেছে। চক্রটি প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে এলাকার লোকজন প্রতিবাদ করতে পারেনি। চোখের সামনে পাহাড় ধ্বংসের চিত্র দেখে আসছে তারা।
তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলতে রাজি হয়নি মহেশখালী বনবিভাগের দায়িত্বরত কোনো কর্মকর্তা। ফোনে যোগাযোগ করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলের প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, মহেশখালীতে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ আকারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রশাসন পাহাড় কাটা রোধে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তবে দীর্ঘদিন পর হলেও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালানো হলে পাহাড় কাটার হার অবশ্যই কমে আসবে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা মহেশখালীবাসীর সমন্বয়ক মুহাম্মদ এনামুল করিম বলেন, পাহাড়ের জন্যই বিখ্যাত মহেশখালী দ্বীপ। দ্বীপের সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে এ দ্বীপের পাহাড় ও বন রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু এখানে উল্টো পাহাড় ও বন কাটার মহোৎসব চলছে। আর এসব করছে জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় সংঘবদ্ধ একটি গ্রুপ। পাহাড় ও বন রক্ষায় প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ ইয়াছিন জানিয়েছেন, পাহাড় ও বন রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। পরিবেশ রক্ষা হলে সবাই নিরাপদ থাকবে। এ সময় তিনি পাহাড় ও বন খেকোদের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান।




