শাকিরুল আলম শাকিল: সামাজিক দায়বদ্ধতা ও দায়-দায়িত্ব যেন দিনে দিনে কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবিকতা ছেড়ে সহানুভূতির জায়গা হচ্ছে স্যোশাল মিডিয়ায়তে। ব্যাপারটা এমন, এখন কোথাও কেউ বিপদে পড়লে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিক কয়েকটি ছবি তুলেই চুকিয়ে ফেলা হচ্ছে দায়-দায়িত্বের সব খাতা।
মানবিকতা যেখানে ঠুনকো সেই সমাজ যখন বিপর্যয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছাবে তখন সেখানে মানবিক বোধের জাগরণ ঘটবে, এমন প্রত্যাশা করা দুরাশা বৈকি। তবে সেই দুরাশায় কিছুটা আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছে আমাদের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা। কয়েক মাস আগে সিলেটে টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলাফল জলবদ্ধতা, বন্যা। সিলেটের গ্রাম-অঞ্চল ভাসিয়ে বানের জল উঠে পড়ে শহরের জনজীবনে, রাস্তাঘাটে। জীবন বাঁচাতে মানুষ আশ্রয় নেয় আশ্রয় কেন্দ্রে, উঁচু ভবনে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও টেলিযোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে দেশের অন্যান্য জেলার যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিছানায় পর্যন্ত পানি উঠে গেছে ঘুমাবার জায়গা নেয়; চুলা ভিজে গেছে, ঘরে খাবার নেয়, জলজ পোকামাকড়, সাপ, বিচ্ছুর আনাগোনা এমন ভয় ও শঙ্কায় মানবিক বিপর্যয়ে পড়ে প্রায় ১ কোটি মানুষ। টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেখানকার খবর মিডিয়াতে আসতে পারছে না আবার সড়কে পানি উঠে যাওয়ায় সরকারি উদ্ধার কর্মীদেরও পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলাফল তীব্র খাবার পানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট। ঠিক এমন অন্ধকার সময়ে প্রদীপ হাতে দেবদূত হয়ে হাজির হলেন অজস্র আশার আলো। ঠিক যেন সেই ভূপেন হাজারিকার গানে সুর তুলে প্রতিধ্বনিকে মর্মস্পর্শী এবং চিরপ্রাসঙ্গিক করে তোলার তীব্র প্রতিযোগিতা!
দেশের আনাচে-কানাচে থেকে, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ধর্মীয় সংগঠন এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ের অসংখ্য সাহায্য এসে হাজির হলো বন্যাকবলিত এসব এলাকায়। কেউ চাল, ডাল, ওষুধ এনেছে, কেউ শুকনা খাবার, খাবার স্যালাইন, মিনারেল ওয়াটার নিয়ে বন্যায় প্লাবিত প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। গলা জল, হাঁটু জল মাড়িয়ে রাত-দিন খেটেছেন। ত্রাণ বিলিয়েছেন ন্যায্য প্রাপ্যদের মাঝে। এই ত্রাণের অর্থ জোগাড় করেছেন নানাভাবে। শিল্পীরা গান গেয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে মানুষের দারে দারে ঘুরেছে, মিডিয়া ব্যক্তিতরা নিজেদের অনুসারীদের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, ধর্মীয় সংগঠনগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রেখেছে, বর্ণাঢ্য ব্যক্তিরা ব্যক্তি পর্যায় থেকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিতে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে মনে হলেও অদৃশ্য কোনো এক রেখা যেন পুরো কাজকে সুসমন্বিত করেছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে স্বেচ্ছাসেবকদের ত্রাণ বিতারণে সৈন্য, গাড়ি, নৌকা দিয়ে সহযোগিতা করেছে সেনাবাহিনী। আবার স্থানীয়দের দ্বারা স্বেচ্ছাসেবকদের অসহযোগিতা বা হেনস্তা হওয়ার ঘটনাও আমাদের কানে এসেছে। তবে এমন অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটনাকে এড়িয়ে গিয়ে যদি বৃহৎ দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করা যায়, তবে দেখা যাবেÑত্রাণ বিতারণে সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত প্রয়াস যে নজির স্থাপন করেছে তা আমাদের দৃঢ়ভাবে ভাবতে সাহায্য করাচ্ছে যে, দেশে আশু যেকোনো দুর্যোগ বা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা মোকাবিলা করার মতো যথেষ্ট আত্মিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে আমাদের।
মানুষ হলো সমাজবদ্ধ জীব। ব্যক্তি মানুষের সব সার্থকতা সমাজকে কেন্দ্র করেই। সমাজে স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করেই মানুষের সম্পূর্ণতা। কিন্তু মানুষ দল বেঁধে বাস করলেই তা সমাজ হয় না। প্রত্যেক মানুষ একে অপরের কল্যাণের কথা ভেবে সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিয়ম ও শৃঙ্খলার অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বাস করলে সেই জনগোষ্ঠীকে সমাজ বলে। এই সমাজকে বাঁচিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি মানুষের অন্যতম দায়বদ্ধতা। মানুষ যদি বিপদে মানুষের পাশে এসে না দাঁড়াই, সাহায্যের হাত না বাড়ায় তবে সে সমাজ-সভ্যতা খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। অতীতের নানা অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি দেশের যেকোনোপ সংকটকালীন পরিস্থিতিতেই সাহায্যের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে আমাদের অজস্র স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হাজির হয়েছেন। সরকারি উদ্ধারকর্মী, সামরিক বাহিনীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর সময় আমরা এমনটা দেখেছি। কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের ট্র্যাজিডির সময়েও এমন সৌহার্দ্য দেখার সুযোগ হয়েছে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অগ্নিদগ্ধ এলাকা থেকে মানুষকে উদ্ধার করছে স্বেচ্ছাসেবী জনতা। ‘রক্ত দিতে চাই’ প্ল্যাকর্ড নিয়ে হসপিটালের গেটে দাঁড়িয়ে থেকেছে, ওষুধ, খাদ্য এমনকি অর্থেরও জোগান দিয়েছে। সত্যি কথা হলো, সংকটের সময় আমাদের মানবিকতা, আমাদের ভালো দিক, মন্দ দিকÑদুটোই প্রকাশিত হয়। বিপদের সময় যারা ভীরু, তারা ঘরে খিল দিয়ে বসে। যারা সাহসী, তারা মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ায়। মানবিকতার এই চরম সংকটকালে আমাদের মানবিক হিরোরা যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে তা নিঃসন্দেহে জাতির জন্য গর্বের। এমন দৃষ্টান্ত আমরা পুনঃপুন দেখতে চাই।
মুক্ত লেখক
শাহজাদপুর, ঢাকা ১২১২