উদ্বেগ পরিবেশবাদীদের
শেয়ার বিজ ডেস্ক: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল ডেটাসেন্টার বাজারে পরিণত হয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির অর্থনীতিতে ডেটাসেন্টারের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলছেন, পরিবেশর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। খবর: আসাহি শিম্বুন।
জোহর প্রদেশে বিশাল ডেটা সেন্টার রয়েছে। এই প্রদেশটিতে ২০১৯ সালে ১ দশমিক ৬ গিগাওয়াটের ডেটাসেন্টার স্থাপন করা হয়। ডেটাসেন্টারগুলো আকারে বেশ বড় এবং জানালাবিহীন। ভবনগুলো কম্পিউটারের তাক দিয়ে পূর্ণ, যাতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন। এসব স্থাপনা সবসময় ঠান্ডা রাখতে হয়। অতিরিক্ত গরমে ক্ষতিগ্রস্ত যেন না হয়, সেজন্য এয়ার কন্ডিশনার সিস্টেমের উপর নির্ভর করতে হয়।
প্রযুক্তি সংস্থাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। কেনাঙ্গা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের গবেষকদের মতে, ২০৩৫ সালের মধ্যে জোহর প্রদেশে তাই বিদ্যুতের চাহিদা ৫ গিগাওয়াটের বেশি হতে পারে, যা ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ার সমগ্র বিদ্যুৎ চাহিদর অর্ধেকের বেশি।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির মতে, ২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় বিদ্যুৎ চাহিদার ৯৫ শতাংশের বেশি আসে জীবাশ্ম জ্বালানী থেকে। দেশটি এখন বৈশ্বিকভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানিকারক। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত বছরের সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, বড় প্রকল্পগুলোয় জ্বালানির জন্য প্রয়োজনে রপ্তানি কমিয়ে আনা হবে।
এশীয়ার টাইগার হিসেবে খ্যাত দেশটির ১৯৯০–এর দশকে অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। এর মধ্যম–আয়ের দেশে পরিণত হয়। সরকার আশা করছে, ডেটা সেন্টারগুলো অর্থনীতিকে আধুনিকীকরণ করবে এবং পরোক্ষভাবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতের মত অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর দেশগুলোর সঙ্গে মালয়েশিয়া প্রতিযোগিতা করছে। এজন্য ডেটাসেন্টারের উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে, যার জন্য দরকার জমি, পানি এবং বিদ্যুৎ। এছাড়া এসব সেন্টারে কর্মসংস্থানের গুরুত্বও কম। আমেরিকান অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গুড জবস ফার্স্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশির ভাগ ডেটাসেন্টারে ৩০ থেকে ৫০টি স্থায়ী কাজের সুবিধা রয়েছে। বৃহৎ সেন্টারে সর্বোচ্চ ২০০টি কর্মসংস্থান হতে পারে।
আমস্টারডাম-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ট্রান্সন্যাশনাল ইনস্টিটিউটে ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করা সোফিয়া স্কাসেরার মতো কিছু বিশেষজ্ঞরা বলেন, মালয়েশিয়ার ধারনাকে বলা হয়, ডিজিটাল ঔপনিবেশিকতা। দেশটি ধনী দেশগুলোর জন্য নিজেদর জমি ভাড়া দিচ্ছে, তৈরি করছে ডেটাসেন্টার। প্রকৃতপক্ষে, মালয়েশিয়ার ডেটাসেন্টারের ক্ষমতার একটি ছোট অংশ ব্যবহারের সুযোগ পান স্থানীয়রা। দেশটি সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পূর্ব এশিয়া, চীন এবং ইউরোপে পরিষেবা দেয়। ডেটাসেন্টারগুলোয় পরিচালনায় রয়েছে আমেরিকার ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইকুইনিক্স এবং মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি চীনা প্রতিযোগী জিডিএস হোল্ডিংস। জিডিএস হোল্ডিংস আলিবাবার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের সঙ্গে কাজ করে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে এআই প্রতিযোগিতায় মালয়েশিয়ার এ ডেটাসেন্টারগুলোর ভূমিকা রয়েছে। ২০২২ সালে ‘চ্যাটজিপিটি’ লঞ্চ করে বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ওপেন এআই। এরপর এআই বাজারে আধিপত্য বজায় রাখে দেশটির কোম্পানিগুলোই। গুগলের ‘জেমিনাই’, মেটার ‘লামা’, মাইক্রোসফটের ‘কোপিলট’, অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড’সহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন নতুন সংস্করণ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ক্রমাগত শক্তিশালী করে। এমনকি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইতে ৫০০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয় ওপেন এআই, ওরাকল ও সফটব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উদ্ভাবনকে শাণিত করার পাশাপাশি চীনকে এআইয়ের অ্যাডভান্স প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে একের পর এক পদক্ষেপ নিতে থাকে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২২ সালের অক্টোবরে চীনের কাছে এআই চিপ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এরপর ২০২৩ সালের অক্টোবরে ভিন্ন ধরনের এআই চিপও নিষেধাজ্ঞার আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দেন।
সিঙ্গাপুরের প্রিন্সটন ডিজিটাল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সিইও রঙ্গু সালগাম বলেন, ডেটাসেন্টারের জন্য জোহরে ১৭০ মেগাওয়াট সাইট তৈরি করা হচ্ছে। ৪০ মেগাওয়াটের বড় ডেটাসেন্টারের জন্য সাধারণত সাতটি ফুটবল মাঠের সমান জমির প্রয়োজন — যেখানে প্রায় ৩৬ হাজার আমেরিকান বাড়ির জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব।
