মেট্রোরেলে কেন ভ্যাট আরোপ?

মারুফ হাসান ভূঞা : মেট্রোরেল রাজধানীবাসীর জন্য দ্রুততম পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বেশ সাড়া ফেলেছে। মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর রাজধানীবাসী ভেবেছিল, এ বুঝি দীর্ঘ ভোগান্তি, যানজটের অবসান ঘটেছে। দীর্ঘ প্রত্যাশা ছিল, মেট্রোরেল যেহেতু সরকারি পরিষেবা, তাই এই পরিষেবার সুফল পেতে রাজধানীবাসীকে আর কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে না। বিশেষ করে মেট্রোরেল রাজধানী শহরের সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য বিরাট আশীর্বাদ।

কিন্তু রাজধানীবাসীর সে প্রত্যাশা ও আশীর্বাদ মেট্রোরেলের ভাড়া বিবেচনায় এটি একটি ব্যয়বহুল পরিষেবা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা চালু নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের আগে থেকে। কিন্তু মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি। যার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা তিন, চার দফা আন্দোলন করেছে, অন্তত যেন শিক্ষার্থীদের জন্য মেট্রোরেলে হাফ ভাড়া কার্যকর করা হয়। শিক্ষার্থীদের রাজধানীতে প্রাত্যহিক ক্লাস ও পরীক্ষায় রাজধানীর যানজট বিরূপ প্রভাব পড়ে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস সময়মতো উপস্থিত হওয়া ও তীব্র যানজটে অসুস্থ হয়ে প্রাত্যহিক ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে হয়। এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। শিক্ষকদেরও একই ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অন্য দিকে রাজধানী শহরে বোর্ড পরীক্ষাসহ ভর্তি পরীক্ষায় বিভিন্ন সময়ে যানজটের ফলে সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পেরে, পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার সংবাদ প্রতি বছর সংবাদের শিরোনাম হয়। যার ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আশা ছিল, সরকার অন্তত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য মেট্রোরেলে হাফ ভাড়া কার্যকর করবে।

মেট্রোরেল উত্তরা-মতিঝিল অংশের ভাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে দ্বিগুণ ও তিনগুণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন যাত্রীকে একটি স্টেশন থেকে অন্য একটি স্টেশনে পৌঁছাতে গুনতে হবে ২০ টাকা, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পৌঁছাতে গুনতে হবে ১০০ টাকা, যা ভারত, পাকিস্তানের মেট্রোরেলের ভাড়ার চেয়ে চারগুণ বেশি। কলকাতায় সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ রুপি বা ৬ টাকা, ২৫ রুপি বা ৩১ টাকায় কলকাতায় ২০ কিলোমিটার যাতায়াত করা যায়। বাংলাদেশের উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত করতে হয় একজন াত্রীকে ২০ কিলোমিটারে ১০০ টাকা বহন করতে হয়।

পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছে, সে দেশেও মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া বাংলাদেশী টাকায় ৯ টাকা ও সর্বোচ্চ ১৮ টাকা।

মেট্রোরেলে চালু হওয়ার পর এই পরিষেবা মানুষ প্রাণবন্তভাবে ব্যবহার করছে, কারণ যানজটের তীব্র ভোগান্তি বেয়ে চলতে চলতে রাজধানীবাসীর দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়ে এই পরিষেবা ব্যবহার করছে। রাজধানীবাসীর

আয় অনুপাতে ব্যয় বেড়েছে, বাজারে

রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত

ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে।

এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন করে মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ ফের মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা, যা এই বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এটি জনবান্ধব পরিকল্পনা হতে পারে না; বরং হঠাৎ এমন পরিকল্পনা রাজধানীবাসীর জন্য বিব্রতকর ও অযুক্তিক। মেট্রোরেল আইন ২০১৫ এর ১৮ (২) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মেট্রোরেলে পরিচালনা ও জনসাধারণের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করা হবে। ২০১৬-এর ২২ (ঘ) তে বলা হয়েছে অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা হবে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে। অথচ এই আইনের যথাযথ নিয়ম মেনে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি এবং মেট্রোরেলে নতুন করে যে ১৫% ভ্যাট আরোপের কথা বলা হচ্ছে সেটিও মেট্রোরেল আইন পুরোপুরি অনুকরণ করা হয়নি। মেট্রোরেল নির্মাণে সরকারের ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি যে ব্যয় হয়েছে, সেটি জনগণের ভ্যাট-ট্যাক্সের টাকা থেকে দেয়া হবে। আর জনগণ যদি তাদের প্রত্যাশিত ভাড়া দিয়ে যাতায়াত না করতে পারে, এর ফলে তো ধীরে ধীরে সরকারি পরিষেবার প্রতি জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। সরকারি পরিষেবা যদি জনগণের জন্য জনবান্ধব না হয়ে, জনদুর্ভোগ হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা জনগণের জন্য কষ্টসাধ্য হয়। তাহলে তো জনগণের আত্মসন্তুষ্টি হবে না। জনগণ তার সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে উপার্জিত অর্থ থেকে রাষ্ট্রকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছে। আর সে জনগণ যদি রাষ্ট্রীয় পরিষেবার প্রাণবন্ত সুফল না পায়। তাহলে কি জনগণ শান্তিতে থাকতে পারে? রাষ্ট্রের কাজ জনগণকে শান্তিতে রাখা, ভোগান্তিমুক্ত রাখা।

সুতরাং সরকারের উচিত মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর নতুন যে কর আরোপের কথা বলা হচ্ছে সেটি যেন বাতিল করা হয়। মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল আইন ২০১৫ এবং ২০১৬ অনুযায়ী জনগণের আর্থিক সচ্ছলতার বিষয় যেন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া কার্যকর করা। দেশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত এই পরিষেবা সরকার চাইলে অনায়াসে দিতে পারে।

 

মিরপুর, ঢাকা