‘চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে অর্থের অপচয়, প্রত্যাশার ভরাডুবি’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তাতে বিগত সরকারের দায়িত্বহীনতাই সামনে এসেছে। এর আগে বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে এমন অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলোর সারাৎসার হলো যথানিয়মে সমীক্ষা ছাড়াই হাতে নেয়া হয়েছে প্রকল্প; সম্ভাব্যতা যাচাই হয়নি সেতু, ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে কী পরিমাণ যানবাহন চলাচল করবে; প্রকল্প শুরুর আগে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে করা হয়নি জিওমেট্রি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন।
রেল, সড়ক ও বড় অবকাঠামো উন্নয়নে গত দেড় দশকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, তাতে দেশ কতটা উন্নত হয়েছে, ব্যবহারকারীরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছেন বা আদৌ পেয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। উদাহরণ হিসেবে ডেমু ট্রেন ও রাজধানীর মগবাজার ফ্লাইওভারের কথা বলা যায়। ডেমু এসেছে ধূমকেতুর মতো প্রবল গতিতে। কিন্তু পাঁচ বছর না যেতেই অর্ধেকের বেশি ডেমু অকেজো হয়ে পড়ে। মেরামতের অবকাঠামো না থাকায় সেগুলো সচলও করা যায়নি। পরে জানা গেছে, সমীক্ষা না করেই প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে।
একইভাবে বলা যায়, মগবাজার ফ্লাইওভারের কথা। এটির ব্যয় ও সময় কয়েক দফা বাড়াতে হয়েছে। এখানেও পরে জানা গেছে, সমীক্ষা না করেই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। কতটা দায়িত্বহীনভাবে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে, একটি ছোট উদাহরণ থেকে সহজেই অনুমেয়। আমাদের দেশে চার চাকার সব যন্ত্রচালিত যানের চালক বসেন ডান পাশে। অথচ মগবাজার ফ্লাইওভারে নকশা করা হয়েছে, যেক্ষেত্রে চালক বাঁ পাশে বসেন এমন যান চলাচলের উদ্দেশ্যে। এটি সংশোধন করতে গিয়ে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা গচ্চা গেছে। বারবার ভুলভাবে সমীক্ষা করায় রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়ে ক্ষেত্রবিশেষে লোপাটও হয়েছে বিপুল অর্থ। অপরিকল্পিত ও প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করেই প্রকল্প না নেয়ায় রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হয়ে সেটির আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ‘চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। খবরে বলা হয়, সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২৫ সালে মূল রাস্তায় দৈনিক ৮১ হাজার ৪৭১ গাড়ি চলার কথা থাকলেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে তার পাঁচ শতাংশও গাড়ি ওঠেনি।
অন্যদিকে সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রকল্প ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে ১২০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকলেও খরচ হচ্ছে প্রতি কিলোমিটারে ২৮২ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ দৈনিক পাঁচ লাখ টাকা করে আয় হলে প্রকল্পের ব্যয় উঠতে সময় লাগবে প্রায় ২৩৫ বছর।
এভাবে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় দুঃখজনক। প্রশ্ন উঠবে, আর কয়টি প্রকল্প প্রকল্প ব্যর্থ হলে কিংবা কত হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার থেকে নিবৃত্ত হব আমরা! বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি সহায়তা নিতে গেলে সমীক্ষা লাগে, শর্ত পূরণ করতে হয়। সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করে এবং কোন পথে কত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা যেতে পারে, যান চলাচল করতে পারে, তা নিয়ে নিবিড় সমীক্ষা কোনো প্রকল্পে নেয়া হলে রাষ্ট্রীয় অর্থ গচ্চা যাওয়ার আশঙ্কা কমবে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হবে না।




