জিএম জয়, রংপুর : একে একে হারিয়ে যাচ্ছে রংপুরে সব সিনেমা হল। গত দুই দশকে বন্ধ হয়েছে ১০টিরও বেশি হল। সেখানে গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক স্থাপনা। বর্তমানে কোনোমতে টিকে থাকা দুটি সিনেমা হলও রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে।
জানা যায়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহর প্রাচীনকাল থেকেই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চার উর্বরভূমি হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষের এ বাংলার প্রথম সিনেমা হলটি ছিল এই নগরীতেই। হলের নাম ছিল রংপুর ড্রামাটিক হল। ১৯৪৭ সালে রংপুর ড্রামাটিক হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মডার্ন হল। এর বেশ কয়েক বছর পর সেই মডার্ন হলটিকে সংস্কার করে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রসহ নাটক-থিয়েটারের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। পরে এই হলটির নাম রাখা হয় টাউন হল। এখন সেখানে আর সিনেমা প্রদর্শিত হয় না। বর্তমানে এটি রংপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণ। এখানে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশসহ নিয়মিত বিভিন্ন সেমিনার হয়।
টাউন হল ছাড়াও দুই দশক আগেও রংপুরে অন্তত ১২টি সিনেমা হল সচল ছিল। ওই সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের দাপট আর সিনেমা হলগুলোর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি ছিল ব্যাপক। বর্তমানে বেশিরভাগ হলের অস্তিত্ব না থাকলেও এখনও ‘লক্ষ্মী হলের মোড়’, ‘ওরিয়েন্টাল মোড়’, ‘দরদী হলের মোড়’, ‘নুরমহল (আকাশ) মোড়’, ‘বিডিআর হল মোড়’, ‘সেনা অডিটরিয়াম মোড়’ ও ‘শাপলা হল’, ‘চায়না হল’ ও ‘মিতালী হল’সহ বিভিন্ন হলের নামডাক বা খ্যাতি রংপুরে রয়েছে।
কিন্তু গত দুই দশকে সিনেমা হল ব্যবসায় অকল্পনীয় ধস আর অশ্লীলতায় ভরা নি¤œমানের নকল চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য মুখ থুবড়ে পড়েছে সিনেমা হল। দর্শকরাও হয়েছে হলবিমুখ। এ কারণে হল মালিকরা ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। সিনেমা হলগুলোয় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে তালা। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে রংপুরের বেশিরভাগ সিনেমা হলই এখন শুধুই ইতিহাস। সচল রয়েছে এখন শুধু শাপলা টকিজ ও আকেশ টকিজের নাম। বাকি সব বন্ধ হয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে গড়ে ওঠা শাপলা টকিজ এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এই হলটির মূল মালিক নজরুল ইসলাম মাসুমের মৃত্যুর পর তার ভাই মিন্টু মিয়া হলের দায়িত্ব নেন। কিন্তু হলের ব্যবসা ভালো না হওয়ায় শাপলা টকিজ ভাড়া দিয়ে দেয় কামাল হোসেন নামে ঢাকার চলচ্চিত্র প্রযোজকের কাছে। সেই শাপলা টকিজের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন শাহাবুদ্দিন নামে হল ব্যবস্থাপক। তিনি ব্যবসার মন্দাভাবে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, আশা ছিল জেলার উন্নত মানের শাপলা সিনেমা হল ভালো চলবে। কিন্তু এর অবস্থা আরও খারাপ। এভাবে লোকসান হতে থাকলে হলটি চালানো আর সম্ভব হবে না।
শাহাবুদ্দিন জানান, বর্তমানে তার শাপলা টকিজে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে সিনেমা হল মালিকের ভাড়া দেয়া, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু চলচ্চিত্রশিল্পকে টিকিয়ে রাখতেই শাপলা হল ভাড়া নিয়ে ভর্তুকি দিচ্ছেন তার মালিক। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু চলচ্চিত্রকে ঘিরে ভালো ব্যবসা হয়েছে এবং ঈদে এখনও সেই রেশ রয়েছে বলে জানান তিনি।
আকাশ টকিজের জেনারেল ম্যানেজার রকিবুল আজাদ বলেছেন, করোনাকালে প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। তিন মাস আগে চালু হয়েছে। খুব একটা ভালো চলছে না। সরকারের অনুদান দেয়ার কথা ছিল, সেটা এখনও আমরা পাইনি। অর্থাভাবে ঠিকমতো সংস্কার হচ্ছে না। এখন সিনেমা হলের বসার সিট, সাউন্ড সিস্টেম ও ডেকোরেশন খুব ভালো অবস্থায় নেই।
এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, চায়না টকিজ, নুর মহল ও দরদী সিনেমা হল এখন গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। সেনা অডিটোরিয়াম বন্ধ করে দিয়ে সেখানে আর্মি মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলাসহ ক্লিনিক ও চিকিৎসকদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। লক্ষ্মী সিনেমা হলের যন্ত্রপাতি অনেক আগেই লোপাট হয়ে গেছে। অবকাঠামোও প্রায় ধ্বংসের পথে। ওরিয়েন্টাল সিনেমা হলে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে অনেক আগেই। দরদী হলটি ভেঙে সেখানে করা হয়েছে দোকানপাট।
সিনেমা হল ও দেশীয় চলচ্চিত্র রক্ষায় সরকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের যতœবান হওয়া দরকার বলে মনে করেন রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদের সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী মো. জুননুন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো চলচ্চিত্র। সুস্থ চিন্তা-চেতনায় মানুষকে শাণিত করতে চলচ্চিত্রশিল্পকে রক্ষা করা দরকার। ফলে এ কাজে সরকার ও চলচ্চিত্র নির্মাণকারী উভয়কে যতœবান হতে হবে। আর এ দুটি বিষয় সমন্বিত হলে আমাদের চলচ্চিত্রের হারানো গৌরব ফিরে না এলেও মানুষ সিনেমা হলমুখী হবে বলে আমি মনে করি।