বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। মাছে-ভাতে বাঙালির নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। বছরের প্রায় সময়েই অসাধু সিন্ডিকেট চক্রের মুনাফালোভী মানসিকতার কারণে চড়ামূল্যে পণ্যদ্রব্য কিনতে হয়, যা স্বাভাবিক বাজারদরের চেয়েও দেড় থেকে দুই গুণ বাড়তি মূল্য হয়ে যায়। গত তিন বছরের মধ্যে পেঁয়াজ ও লবণের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির ঘটনার পর এখন সকল পণ্যেরই মূল্য বৃদ্ধি হয়ে দরিদ্র নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের নেই কোনো মাথা ব্যথা, দাম কমার বিষয়েও সঠিক কোনো তথ্য নেই কারও কাছে। সরকারের কাছে মানুষের বহু প্রত্যাশার মধ্যে অন্যতম প্রত্যাশা হলো দ্রব্যমূল্যের স্বাভাবিক মূল্য বজায় রাখা। কিন্তু ভোক্তাদের পাশাপাশি সরকারকেও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হতে দেখা যায়। যার ফলে বর্ধিত মূল্যে মাসের পর মাস পণ্য বিক্রি হলেও সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে না। এ ছাড়াও বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও দেশের মানুষের পূর্ণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করার মতো খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনের বিষয়ে আশানুরূপ কোনো কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায় না। অথচ দেশব্যাপী লাখ লাখ বিঘা জমি পড়ে থাকে চাষহীন। কৃষকরাও উৎপাদিত পণ্যের প্রত্যাশানুরূপ মূল্য না পেয়ে কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যার কারণে কৃষিপ্রধান দেশ হলেও বিদেশনির্ভর হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধির ফলে বাজারে অস্থিরতা চলাকালীন সময়েই সংযম ও আত্মশুদ্ধির পবিত্র মাহে রমজানের আগমন ঘটেছে। মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা রমজান মাসে নাগরিকরা স্বাভাবিক মূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার স্বপ্ন দেখলেও প্রতিবারই আমাদের হতাশ হতে হয়েছে। অথচ অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশগুলো কিংবা অনেক অমুসলিম দেশেও মুসলিম ব্যবসায়ীদের চিত্র বেশ ভিন্ন। তারা বছরের ১১ মাস ব্যবসা করে পবিত্র রমজান মাসকে ইবাদতের মাস হিসেবে নামাজ, রোজার বাইরেও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি না করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মাঝে রাখে। রমজানের মূল স্পিরিট সংযমকে বাস্তবায়ন করে কাজেকর্মে। বিপরীতে আমাদের দেশে রমজানকে টার্গেট করা হয় আয় রোজগারের জন্য। যেন ১১ মাস তারা লোকসান গুনেছে, তাই রমজানেই সব সুদে আসলে পূরণ করতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নাগরিকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকলে, পণ্যমূল্যের দাম আয়ের তুলনায় সমান হারে বাড়বে, তা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মানুষের আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির ফলে চরম ভোগান্তিতে নাগরিকরা। শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, কাপড়, নির্মাণ সামগ্রী, ক্রোকারিজসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে অস্বাভাবিক বর্ধিত মূল্যে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় মধ্যবিত্তদের। আয়ের সঙ্গে খরচের সামঞ্জস্য না থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগে পতিত হতে হয়। নাগরিকরা খাদ্যকষ্টে ভুগলে কিংবা খাদ্য দুর্ভোগে পতিত হলে এর দায়ভার সরকারের ওপরই বর্তায়। সেই সঙ্গে দেশের নাগরিক হিসেবে ব্যবসায়ীদেরও দায় আছে, দায়িত্ব আছে সাধারণ নাগরিকদের প্রতি।
সংযম ও আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আমাদের মাঝে রমজান আসে। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে বর্তমানে অস্থির হয়ে থাকা বাজার পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্থির হবে অর্থাৎ সাধারণ নাগরিকরা যাতে তাদের সাধ্যমতো সকল নিত্যপণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে পবিত্র সিয়াম সাধনায় মনোযোগী হতে পারে, সেই ব্যবস্থা সরকার করতে হবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করার মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখে দিতে হবে। মুসলিম ব্যবসায়ী হিসেবে শুধু ব্যবসার দিকে মনোযোগী না হয়ে সেবার মানসিকতা বজায় রেখে রমজান মাসে সীমিত লাভে ব্যবসা করে সাধারণ মানুষদের কষ্ট লাগবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। পবিত্র রমজান উপলক্ষে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়িয়ে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার মাধ্যমেই রমজানের মূল স্পিরিট বাস্তবায়ন করতে হবে।
জুবায়ের আহমেদ
শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম), কাঁটাবন, ঢাকা