রাজধানীতে জলাবদ্ধতায় এবারও মুক্তি মিলছে না মানুষের

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীতে এবারও মুক্তি মিলছে না মানুষের। গত বুধবার ভোরে ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। প্রায় আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাজধানীর অনেক স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে বেশি ভোগান্তির শিকার হন নগরবাসী।

প্রতি বছরই জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় রাজধানীবাসীকে। বৃষ্টি হলেই নগরীর অলিগলি ও ছোট পরিসরের রাস্তাগুলোয়ও পানি জমে যায়। পানি নিষ্কাশনের পথগুলো আবর্জনায় ভরাট থাকায় যথাসময়ে বৃষ্টির পানি বের হতে পারে না। উল্টো ড্রেন উপচে পড়া ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। ড্রেনেজ লাইন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এবং খালগুলোর পানিপ্রবাহ ঠিক না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাজধানীর বেশিরভাগ সড়ক।

রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া, গ্রিন রোড, কাঁঠালবাগান, কারওয়ানবাজার, ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোড, আসাদগেট, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, মতিঝিলের কিছু অংশ,  সোনারগাঁও মোড়, রামপুরা ও খিলগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা এবং মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। তবে অনেক এলাকায় পানি অল্প সময়ের মধ্যে নেমেও যায়। দীর্ঘসময় জমে না থাকলেও রাজধানীর বেশ কয়েকটি প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে নগরবাসীর কপালে। এবারের বর্ষা মৌসুমেও হয়তো জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলছে না তাদের!

গত বুধবার ভোরে আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় রাজধানীর কাজীপাড়ার প্রধান সড়কসহ আশপাশের এলাকা। ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয়রা। ওই সময়

 কথা হয় স্থানীয় বাড়ির মালিক হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। জলাবদ্ধতার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সারাজীবন কাজীপাড়ার বাসিন্দারা জলাবদ্ধতার ভোগান্তি ভোগ করে আসছে। এবার খালগুলো সিটি করপোরেশনের অধীনে আসার পর ভেবেছিলাম জলাবদ্ধতা আর হবে না। কিন্তু বুধবার ভোরের সামান্য বৃষ্টিতে এ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তাহলে লাভ কী হলো? স্বাভাবিকভাবে উপলব্ধি করা যায়, এবারের বর্ষা মৌসুমেও আমাদের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

বাড্ডা লিংক রোডের বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, এটা এ এলাকার স্বাভাবিক চিত্র। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে অনেকবার বলা হয়েছে, আগের মতো জলাবদ্ধতা হবে না। কিন্তু গতবার জলাবদ্ধতায় ভুগেছি। আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতে বুধবার পানি জমতে দেখলাম। এবারের বর্ষা মৌসুমেও রক্ষা পাব না।

কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এ এলাকার ড্রেনগুলো এখনও পরিষ্কার করা হয়নি। ড্রেন দিয়েই পানিগুলো খালে যাবে। সিটি করপোরেশন থেকে ড্রেনগুলো পরিষ্কারের কথা বারবার বলা হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনও চোখে পড়েনি। ফলে এবারও জলাবদ্ধতা থেকে আমরা মুক্তি পাচ্ছি না।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, খালগুলো দখলমুক্ত করে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। প্রথমে খালে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা হবে। এরপর খাল এলাকার সৌন্দর্য বাড়ানো হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়িত হলে বর্ষাকালে ডুববে না রাজধানী। মুষলধারে বৃষ্টি হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি খাল ও ড্রেন দিয়ে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীতে নেমে যাবে। তবে আসন্ন বর্ষার আগে সব কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বিধায় এবারও রাজধানীর কিছু কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেবে বলে আশঙ্কা সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে হলে প্রথমেই খালের পানির প্রবাহ ঠিক করতে হবে। খালের সীমানাগুলো নির্ধারণ হলেই আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ওয়াসার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেয়ার পর জিরানি, মান্ডা, শ্যামপুর ও কালুনগর খালগুলোর শাখা-প্রশাখা এবং পান্থপথ ও সেগুনবাগিচার বক্স কালভার্ট থেকে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এসব খাল ও বক্স কালভার্ট থেকে এক লাখ তিন হাজার ৫০০ টনের বেশি বর্জ্য এবং ছয় লাখ ৭৯ হাজার টন পলি অপসারণ করা হয়েছে। এছাড়া ওয়াসার কাছ থেকে বুঝে পাওয়া অচল পাম্প স্টেশনগুলো সচল করা হয়েছে।

ডিএসসিসির কালুনগর, জিরানি, মান্ডা ও শ্যামপুর খাল উদ্ধার করে সেগুলো দৃষ্টিনন্দন করতে ৯৮১ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। খালগুলো উদ্ধার করে দুই পাড়ে বানানো হবে ওয়াকওয়ে, থাকবে বাইসাইকেল লেন, মাছ ধরার শেড, বাগান, ফোয়ারা, ফুটওভার ব্রিজ, ইকোপার্ক, পাবলিক টয়লেট, খেলার মাঠসহ নানা উদ্যোগ।

এছাড়া ধোলাইখাল, পান্থপথ ও সেগুনবাগিচার বক্স কালভার্ট পরিষ্কারে ৩০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি। তবে এখন পর্যন্ত খালগুলো উদ্ধার করে পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তাদের আশা, এরই মধ্যে যে কাজ হয়েছে তার সুফল আগের চেয়ে ভালো পাওয়া যাবে। তুলনামূলকভাবে জলাবদ্ধতা কমবে, তবে পুরোপুরি মুক্তি মিলবে না।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস সাংবাদিকদের বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে এবার আরও বেশি সুফল পাবেন নগরবাসী। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গত বছর কিছুটা সুফল পেয়েছি। এবার আরও বেশি পাব। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।