রাজশাহীর বাজারে উঠছে আগাম লিচু, দাম-অপরিপক্বতায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : রাজশাহী অঞ্চলে চলতি মৌসুমের আগাম লিচু উঠতে শুরু করেছে। তবে এ বছর প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের কিছু আধুনিক ব্যবস্থাপনায় গাছে আগাম মুকুল ও গুটি দেখা দিলেও লিচুর উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে দেশের বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহীর লিচু দীর্ঘকাল ধরে দেশের অন্যতম সুস্বাদু ফল হিসেবে পরিচিত। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন, অপরিপক্ব লিচুর আগাম বাজারজাতকরণ এবং সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থার অভাবের কারণে
রাজশাহীর লিচু চাষ আজ এক কঠিন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রাজশাহী জেলায় প্রায় ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ করা হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮০০ টন। তবে লিচু গাছে গুটি আসার সময় হঠাৎ তীব্র গরম ও বাতাসের কারণে কিছু এলাকার ফলন কমে গেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। লিচুচাষিরা এতে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

ফল গবেষণা কেন্দ্রের (রাজশাহী) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে জানান, লিচুর মুকুল আসার সময়ে হালকা ঠাণ্ডা আবহাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে শুষ্ক ও স্থিতিশীল আবহাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ বছর আবহাওয়া পুরোপুরি অনুকূলে না থাকায় অনেক এলাকায় লিচুর গুটি কম এসেছে। বর্তমানে রাজশাহীর সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, কোর্ট বাজার ও রেলস্টেশন এলাকায় লিচু বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে দাম আকাশছোঁয়া। ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে লিচুর চাহিদা অনেক বেশি, কিন্তু লিচু এখনও পুরোপুরি পাকেনি, তাই ভালো মানের লিচু সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর বাজারে যে সামান্য লিচু আসছে, তার দামও অনেক বেশি।
অন্যদিকে কিছু কৃষক সময়ের আগে লিচু তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। এর প্রধান কারণ দ্রুত বাজার ধরতে পারা এবং কিছুটা লাভ করা। তবে এর ফলে বাজারে লিচুর স্বাদ ও গুণগত মানের অভাব দেখা দিচ্ছে। অপরিপক্ব লিচু বাজারে আসার কারণে দীর্ঘ মেয়াদে রাজশাহীর লিচুর সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা ভালো লিচু না পেয়ে আস্থা হারাতে পারেন, যা এই শিল্পের জন্য একটি বড় হুমকি।

বাঘা উপজেলার একজন লিচুচাষি নুরুজ্জামান জানান, গত বছর তিনি লিচু বিক্রি করে দেড় লাখ টাকার বেশি আয় করেছিলেন এবং এ বছরও তিনি ভালো লাভের আশা করেছিলেন। কিন্তু গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে গুটি আসেনি। আবার দাম ভালো থাকলেও লিচু ছোট ও কাঁচা। চারঘাট, পুঠিয়া, গোদাগাড়ী ও পবা উপজেলার অনেক কৃষকও একই রকম সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যার সমাধানে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া খুবই প্রয়োজন। তারা সময়োপযোগী লিচুর জাত উদ্ভাবন, আবহাওয়াভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা তৈরি, লিচু সংরক্ষণে পর্যাপ্ত হিমাগার স্থাপন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র তৈরি এবং কৃষকদের জন্য সরাসরি বাজারে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ না নিলে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী লিচুশিল্পে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
সবমিলিয়ে লিচুর আগাম আগমন আপাতদৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক ঘটনা মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে দামের অস্থিরতা, উৎপাদন সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গভীর সমস্যা। কৃষি পরিকল্পনা, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় এবং গবেষণানির্ভর পদক্ষেপ ছাড়া রাজশাহীর এই ঐতিহ্যবাহী ফলের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়।