বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছে সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল। এ সময় তারা বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশকিছু প্রশ্ন করে। সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে শেয়ার বিজ। তা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব
ইসমাইল আলী: বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধানে ২০০৯ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক বছর বেশকিছু রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের অনুমোদন দেয় সরকার। তিন ও পাঁচ বছরের জন্য বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হলেও পরে কয়েক দফা চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এতে কোনো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৫ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত চালানো হবে। তবে নতুন করে আর চুক্তি নবায়ন না হলে ২০২৬ সালে শেষ হবে এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ।
সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিষয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চায় আইএমএফ প্রতিনিধিদল। একই সঙ্গে এ খাতে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষে বলা হয়, যেসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সরকার চুক্তি করেছিল, সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এখন ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ পদ্ধতিতে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে নতুন করে আর ক্যাপাসিটি চার্জের প্রয়োজন হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ১৯টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু আছে। এর মধ্যে চলতি বছর ডিসেম্বরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি শেষ হবে। এছাড়া ২০২৩ সালে চুক্তি শেষ হবে দুটি কেন্দ্রের, ২০২৪ সালে ১৩টির, ২০২৫ সালে একটির ও ২০২৬ সালে দুটি কেন্দ্রের। এসব কেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া লাগে। আর ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে ১৪টি কেন্দ্র।
যদিও ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ পদ্ধতি নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। এ পদ্ধতিতে কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার কমপক্ষে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ কেনার শর্ত রয়েছে। আগে এসব কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার কমপক্ষে ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ কেনার শর্ত ছিল। তাই আগের চেয়ে অর্ধেক বিদ্যুৎ বিক্রি করেই আগের সমান বিল পেতে পারে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ফলে ক্যাপাসিটি চার্জ না থাকলেও এসব কেন্দ্রের গড় উৎপাদন ব্যয় খুব একটা কমছে না।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ১২ জুলাই উৎপাদন শুরু করে ভোলার ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ভেঞ্চার এনার্জি নামক সিনহা গ্রুপের এ কেন্দ্রটির লাইসেন্স প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য দেয়া হয়েছিল। তবে দফায় দফায় এর চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চুক্তির মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানো হয়। ফলে ১৭ বছর পর্যন্ত চলবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ২০২৬ সালের জুনে শেষ হবে এ কেন্দ্রের মেয়াদ।
একই অবস্থা আশুগঞ্জের ৫৩ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল কেন্দ্রটির। ইউনাইটেড এনার্জি নামক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল তিন বছরের জন্য। এ কেন্দ্রটি ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি উৎপাদন শুরু করে। তবে কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর কেন্দ্রটি চলবে ১৫ বছর। অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শেষ হবে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ।
শুধু এ দুটিই নয়, মোট ১৫টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে কুমারগাঁও ৫০ মেগাওয়াট এনার্জিপ্রিমা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল তিন বছরের জন্য। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে। তবে কেন্দ্রটি চলছে প্রায় ১৪ বছর ধরে। চুক্তি আর নবায়ন না করলে আগামী ডিসেম্বরে এ কেন্দ্রটির মেয়াদ শেষ হবে।
একই অবস্থা বগুড়ায় ২০ মেগাওয়াটের এনার্জিপ্রিমা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির। এ কেন্দ্রটিরও লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল তিন বছরের জন্য। ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে। এ কেন্দ্রটি চলবে ১৩ বছর। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ১১৫ মেগাওয়াটের কেপিসিএল-২ (খুলনা পাওয়ার কোম্পানি) বিদ্যুৎকেন্দ্রটিরও লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল তিন বছরের জন্য। ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে। এ কেন্দ্রটিও চলবে ১৩ বছর। ২০২৪ সালের ৩১ মে শেষ হবে এর বর্ধিত আয়ুষ্কাল।
একইভাবে ফেঞ্চুগঞ্জের ৫০ মেগাওয়াটের এনার্জিপ্রিমা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল তিন বছরের জন্য। ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে। তবে কয়েক দফা চুক্তি নবায়নের পর কেন্দ্রটি চলবে ১২ বছর, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে যা শেষ হবে। আর প্রিসিশন এনার্জির আশুগঞ্জের ৫৫ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে ২০১০ সালের ৭ এপ্রিল। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর ১৩ বছর চলবে কেন্দ্রটি। ২০২৩ সালের এপ্রিলে এ চুক্তি শেষ হবে।
২০২৪ সালের মে পর্যন্ত চলবে সামিটের ১০২ মেগাওয়াট মদনগঞ্জ, ওরিয়নের ১০০ মেগাওয়াট মেঘনাঘাট, নোয়াপাড়ার ৪০ মেগাওয়াটের কেপিসিএল-৩ এবং ওরিয়নের সিদ্ধিরগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র চারটি। এগুলো উৎপাদন শুরু করে যথাক্রমে ২০১১ সালের ১ এপ্রিল, ৮ মে, ২৯ মে ও ২৪ জুলাই। চারটি কেন্দ্রই পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। তবে কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর চারটিরই আয়ুষ্কাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ বছর।
এদিকে গত জুলাইয়ে আরও চারটি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে চুক্তির মেয়াদ দুই বছর করে বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসব কেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এর মধ্যে সিনহা পাওয়ারের চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরায় অবস্থিত ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তিন বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল।
রাজশাহীর কাটাখালীর নর্দার্ন পাওয়ার সলিউশন ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে ২০১২ সালের ২২ মে। কুইক রেন্টাল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়। একইভাবে পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পাওয়ারপ্যাক ১০০ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল কেন্দ্রটির। ২০১২ সালের ২৭ মার্চ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে।
অপর কুইক রেন্টাল কেন্দ্রটি বাংলাক্যাট গ্রুপের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি অ্যাক্রন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিসেসের। চট্টগ্রামের জুলধায় অবস্থিত ১০০ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১২ সালের ২৬ মার্চ উৎপাদন শুরু করে। পাঁচ বছরের জন্য এর লাইসেন্স দেয়া হলেও এখন তা ১২ বছর পর্যন্ত চলবে।
এর বাইরে ১৫ বছরের জন্য চারটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে জিবিবি পাওয়ারের ২২ মেগাওয়াট বগুড়া কেন্দ্রটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। আর বরকতউল্লাহ ডায়নামিক্সের ৫১ মেগাওয়াট ফেঞ্চুগঞ্জ কেন্দ্রটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে। একইভাবে ২০২৪ সালের মার্চে চুক্তি শেষ হবে দেশ ক্যামব্রিজ এনার্জির কুমারগাঁওয়ে ১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির এবং ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে চুক্তি শেষ হবে শাহজীবাজার ৮৬ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির।
প্রসঙ্গত, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত ১২ বছরে পিডিবিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ৭২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর এ বিলের পুরোটাই গেছে ডলারে। যদিও বর্তমানে কুইক রেন্টালের সংখ্যা কমে এসেছে। তারপরও বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোকে ডলারেই ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।