শক্তি নয়, সমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক বিশ্ব ব্যবস্থা

ইউরোপ সভ্যতা, শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আঁতুড়ঘর হলেও এই মহাদেশের মধ্যেই মানবতার চরম সংকট বিশ্ববাসী উপলব্ধি করেছে। কারণ দুটি বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় এখান থেকেই। ইউরোপ মহাদেশের রাজনৈতিক সংকটের ইতিহাস দীর্ঘকালের। বিভিন্ন সময় ভূরাজনৈতিক সমস্যা রূপান্তরিত হতো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। ইউরোপ তথা সমগ্র বিশ্বের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহের মূল কারণ ছিল তিনটি Sovereignty (সার্বভৌমত্ব),Equality (সমতা) ও Unsolicited interfere (অযাচিত হস্তক্ষেপ)।

ইউরোপ মহাদেশে যুদ্ধবিগ্রহের মূল কারণ ছিল বড় ও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করত না। তারপর আয়তনে বড় রাষ্ট্রগুলো ছোট রাষ্ট্রের প্রতি অসম আচরণ করত এবং যুদ্ধংদেহী ভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো অপর রাষ্ট্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ করত। ফলে ইউরোপ বারংবার যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছে। ইউরোপে সবচেয়ে দীর্ঘতম যুদ্ধ ছিল ৩০ বছরব্যাপী যুদ্ধ। এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৬১৮ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেষ হয়েছিল ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ওয়েস্টফেলিয়ান শান্তিচুক্তির মাধ্যমে।

১৬৪৮ সালে ইউরোপ ৩০ বছরব্যাপী যুদ্ধ (Thirty Years War) থেকে বাঁচে ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তির (Peace of Westphalia) মাধ্যমে। এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া ছাড়াও আরও কিছু ব্যাপারে ইউরোপের দেশগুলো ঐকমত্যে পৌঁছে। তা হলো রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলে সেটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।

ওয়েস্টফেলিয়া শান্তিচুক্তির পর ১৬৫৯ সালে ফ্রান্স ও স্পেন পিরেনিজে শান্তিচুক্তি সম্পাদান করে। এভাবে ইউরোপে শান্তির নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।

আর এই পুরো ব্যাপারটিকে তদারকি করবে তৎকালীন ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো, যারা নিজেদের মাঝে একটি ‘ব্যালান্স অব পাওয়ার’ রাখবে, যার মাধ্যমে তারা যুদ্ধ এড়াবে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই ‘ওয়েস্টফালিয়ান সিস্টেম’ মোটামুটি কাজ করেছে, অর্থাৎ শক্তিশালী দেশগুলোর স্বার্থের দেখভাল করেছে। কিন্তু এর পর থেকে এটি ঠিকমতো আর কাজ করছে না।

অর্থাৎ ওয়েস্টফালিয়ান চুক্তির মাধ্যমে যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির উদ্ভব হয়েছিল, তা এখন মৃতপ্রায়। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে দুর্বল দেশগুলোর ওপর আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। চীনের তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব তোয়াক্কা না করা, রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল, চেচেন সম্প্র্রদায়ের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করা এবং পরিশেষে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেন আক্রমণ।

অর্থাৎ বিশ্বের আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূরাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে সহজে বোঝা যাচ্ছে, বৃহৎ পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আধুনিক সমাজের সভ্য আইনকানুনের পরোয়া করছে না। পরাশক্তিগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো দেয়ার ক্ষমতাকে তাদের কুক্ষিগত করে রেখেছে, ফলে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মনোভাব যেভাবে প্রকাশ পাচ্ছে তাতে আগামী বিশ্ব হয়তো একটি পারমাণবিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। ওয়েস্টফালিয়ান চুক্তির মাধ্যমে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ওপর ইধষধহপব ড়ভ চড়বিৎ বজায় রাখার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে রক্ষকের ভূমিকায় তারা নেই। তারাই বরং আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।

যাদের বিশ্বে গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব এবং শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব ছিল, তারাই বিশ্বে অশান্তি তৈরি করছে। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ছায়াযুদ্ধের ভিকটিম হচ্ছে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো।

তাই বর্তমান সময়ে আবার একটি ওয়েস্টফালিয়া শান্তি চুক্তির প্রয়োজন, যার মাধ্যমে বিশ্বে গড়ে উঠবে শান্তির পরিবেশ, যেখানে একটি রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখবে। শক্তির বিচারে নয়, সমতার ভিত্তিতে বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

আসাদুজ্জামান বুলবুল

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়