সাধন সরকার: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড সোজা না থাকলে একজন মানুষ যেমন দাঁড়াতে পারে না তেমনি মাধ্যমিক শিক্ষা তথা শিক্ষার মেরুদণ্ড ঠিক না থাকলে তা জাতির জন্য অশনিসংকেত বয়ে আনে। মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা বিস্তারে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কেননা মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি পর্যায়ের। মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষকের সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের মতো বেতন-ভাতা পান না। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের (বিএডবিহীন বেতন গ্রেড-১১) সঙ্গে অন্যান্য যৎসামান্য ভাতা (বাড়িভাড়া নির্দিষ্ট ১ হাজার ও চিকিৎসা ভাতা ৫শ) পান। একবিংশ শতাব্দীর এই বিশ্বে মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাওয়া বাংলাদেশের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশে একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন সর্বমোট মাত্র সাড়ে ১৩ হাজার টাকা-এটা অযৌক্তিক নয় কি! এই টাকায় একটা পরিবার কীভাবে চলে নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখেছি কি! মোট টাকার ওপর আবার ১০ শতাংশ বেতন কেটে রাখা হয়। অন্যদিকে সরকারি শিক্ষকরা যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পান। ফলে প্রায় সময় দেখা যায় বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষকতা সমাপ্ত করে একজন শিক্ষককে অল্প টাকার পেনশনে সন্তুষ্ট হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। চাকরি শেষে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার পেনশন পেতে বেসরকারি শিক্ষকদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। অনেক শিক্ষককে টাকার অভাবে রোগেশোকে মারাও যেতে দেখা যায়। এমনটি মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান। সরকারি স্কুলের মতো একই পাঠ্যবই, একই সিলেবাস, একই কর্মঘণ্টা পড়ানোর পরেও বেসরকারি শিক্ষকরা চরম বৈষম্যের শিকার। শিক্ষকের বেতন-ভাতা কম বলে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না। মাধ্যমিক পর্যায়ে বেসরকারি শিক্ষকতা পেশায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য দৃশ্যমান। শিক্ষকদের সম্মানের সঙ্গে মানসম্মত সম্মানিও দরকারÑএটা নীতিনির্ধারকরা যেন ভুলে গেছেন! এমপিওভুক্ত একজন শিক্ষককে চাকরিজীবন শেষে অবসর-কল্যাণ সুবিধার টাকা পেতেও বছরের পর বছর বসে থাকতে হয়। তাই মাধ্যমিক পর্যায়ে সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ যৌক্তিক দাবি।
বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে একটি মাত্র মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি হয়েছে; যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বা বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী মাসিক ১০০ টাকার কম বেতনে পড়াশোনা করছে। অপরদিকে উপজেলা বা গ্রাম পর্যায়ে অপর একজন শিক্ষার্থী সরকারি বিদ্যালয়ের বেতনের পঁচিশ-ত্রিশগুণ টাকা দিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে। উপজেলার সরকারি স্কুলে একজন শিক্ষার্থী যেখানে মাসিক ১০ টাকা বেতনে পড়ালেখা করছে সেখানে পার্শ্ববর্তী বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরকারি বিদ্যালয়ের বহুগুণ অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে স্বল্প আয়ের অভিভাবকরা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ‘ফি’র কারণে তাদের সন্তানদের পড়ালেখা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে! অনেক ক্ষেত্রে পড়ালেখার খরচ না সামলাতে পেরে বহু পরিবারে মেয়েদের বাল্যবিবাহের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে! তাই শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও স্বার্থ বিবেচনা করে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ সময়ের সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করি। এখন এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, পাঠ্যবই, অবকাঠামো, শিক্ষকদের বেতন সবই দিচ্ছে সরকার। তাহলে প্রশ্ন জাগে, সবই যখন দিচ্ছে সরকার তখন আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য যেমন কমবে তেমনি শিক্ষার মানও বৃদ্ধি পাবে। এমনকি সরকার থেকে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেসব সুবিধা দেয়া হয়েছে তার সবই এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদেরও সেসব সুবিধা দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। বর্তমানে একটা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে আয়-রোজগারও নেহাত কম নয়। তাছাড়া জাতীয়করণ করা হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমানো অর্থ আর মাসিক আয় সরকারি কোষাগারে জমা হলে জাতীয়করণে খুব একটা অর্থ লাগার কথা না। মূলত পৃথিবীর বেশিরভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো মনে করে শিক্ষায় বিনিয়োগ বা ব্যয় সবচেয়ে উত্তম বিনিয়োগ। জাতীয়করণে অর্থ বিনিয়োগ করলে তা সামগ্রিক বিচারে পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় সুফল বয়ে নিয়ে আসবে।
এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘদিনের। জাতীয়করণের দাবির মুখে শিক্ষকদের বারবার শুধু আশ্বাস দেয়া হয়েছে। বাস্তবে বেতন বৈষম্যের কোনো সুরাহা হয়নি! এমনকি বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের শতভাগ বোনাসের (বর্তমানে মূল বেতনের চারভাগের একভাগ বোনাস দেয়া হয়) দাবিটিও গত দেড় দশকে পূরণ করা হয়নি। শিক্ষকের জীবনে যদি অর্থকষ্ট থাকে তাহলে শিক্ষক কীভাবে আনন্দের সঙ্গে পাঠদান করবেন? শিক্ষক যদি স্বপ্ন না দেখেন তাহলে শিক্ষার্থীদের কীভাবে আলোকিত করবেন? সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের বেলায় একই যোগ্যতা ও মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলে বেতনের বেলায় কেন বৈষম্য থাকবে? একই কারিকুলাম ও সিলেবাসে পাঠদান হলে বেতনের বেলায় কেন ভিন্নতা? অনেককে বলতে শোনা যায়, মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষার মান পড়ে যাবে! এটা নিতান্তই কল্পনাপ্রসূত ও ভিত্তিহীন কথা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। তখন শিক্ষার মান কি পড়ে গিয়েছিল? অবশ্যই না। বরং মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে সেটাই ছিল যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। সর্বশেষ উপজেলাভিত্তিক কমপক্ষে একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। সেসব বিদ্যালয়ে কী শিক্ষার মান পড়ে গেছে? অবশ্যই না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ অথবা জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনও তা থেকে অনেক দূরে। বিগত কয়েক বছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের বরাদ্দ থাকে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশেরও কম (প্রযুক্তি খাত বাদে)। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে যখন তাকাই বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল সবাই শিক্ষার উন্নয়নে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বরাদ্দ দিয়ে থাকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়, যার মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য ছিল ২২ শতাংশ (১৭৩ কোটি টাকা)। দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পরিবার এমপিওভুক্ত ৫ লাখেরও বেশি শিক্ষকের প্রাণের দাবি মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষার বিকল্প নেই। দেশের সেরা মেধাবীদের যথাযথ সম্মান ও সম্মানি দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার সময় এখনই। মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা হলে গ্রাম-শহর পর্যায়ে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য যেমন কমবে তেমনি সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেশের ভবিষ্যৎ সুনাগরিক সব শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে যাবে। যেসব কারণে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা জরুরি তা হলো: ১. মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা হলে চাকরি শেষে লাখ লাখ শিক্ষকের পেনশনের টেনশন কমবে। ২. মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য কমবে এবং সব শিক্ষাথী সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। ৩. শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার খরচ অনেকাংশে কমে যাবে। ৪. ঝরে পড়া রোধ হবে। ৫. শিশুশ্রম রোধ ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ কমানো সম্ভব হবে। ৬. মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ হবে। ৭. বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। ৮. প্রাইভেট-কোচিং হ্রাস পাবে। ৯. শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হবে। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নতুন কারিকুলাম বিশ্বমানের সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষকদের বেতনভাতা নি¤œমানের কেন? কেন মানুষ গড়ার কারিগররা বৈষম্যের শিকার। মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯০ ভাগের বেশি শিক্ষক (এমপিওভুক্ত) বেতন বৈষম্যের শিক্ষার। শিক্ষকদের মনে চাপা ব্যথা ও কষ্ট রেখে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়! নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করবেন শিক্ষকরা। আর সেই শিক্ষকদের বহুবিধ বৈষম্যের মধ্যে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একবারে না হলেও নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে দ্রুত সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে সব এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ সম্ভব।
শিক্ষক
লৌহজং বালিকা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জ
