এমন কোনো দেশ নেই, যে দেশ বৈশ্বিক মহামারি কভিডের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আমাদের দেশও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সব সাদা চোখে দেখা যায় না। বলা যায়, এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। এর একটি হলো শিক্ষা খাত। ২০২০ সালের মার্চে দেশে কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক থেকে ওই মাসের ১৭ তারিখ দেশের সব স্কুল-কলেজে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। কয়েক দফায় এ ছুটির ব্যাপ্তি ছিল দেড় বছরেরও বেশি। এরপর অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হলেও ডিজিটাল ডিভাইস না থাকায় কিংবা ইন্টারনেটসহ নানা কারণে অনেকে সে সুযোগ নিতে পারেননি। তাছাড়া শ্রেণিকক্ষে অটো প্রমোশন ও আংশিক পরীক্ষা নিয়ে পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের পাস করানো হয়। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপকহারে ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এর আর্থিক পরিমাণ কত, তা সাধারণ মানুষের অজানা। শিক্ষা খাতের ক্ষতির ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব অনুভূত হবে ২০৩০ সাল নাগাদ। শুক্রবার বার্ষিক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে উপস্থাপিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলেছে, এতে দেশের মোট জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্বীকার করতে হবে দীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ধরন ও স্বরূপ বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং ক্রমেই তার আধুনিকায়ন ঘটেছে। কভিডকালে সে ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। ধারণা করা হয়, কভিডের কারণে অনেক শিক্ষার্থী আর কখনও স্কুলে ফেরেনি। কভিডে আমাদের যে ক্ষতি তা সহজে পূরণীয় হবে না। বহুদিন ধরে এর মূল্য দিতে হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সশরীরী উপস্থিতি ও চিন্তা-চেতনা-ভাবনার প্রকাশের মূল কেন্দ্র শ্রেণিকক্ষ ও প্রতিষ্ঠান চত্বর। পাঠদান সাময়িক বিপর্যয় ঘটলেও পরবর্তী-সময়ে অনলাইন পদ্ধতিতে ক্লাস, পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, জুম, ওয়েবিনার প্রভৃতির মাধ্যমে সরকারের প্রচেষ্টা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।
শিক্ষা ও অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে সম্পূর্ণ যুক্ত। শিক্ষায় মানের ঘাটতি কভিডকালে দেশে নতুন যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তা দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কভিডে দেশে উন্নত দেশের মতো প্রাণহানি না হলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আরও ভয়াবহ রকমের দুর্যোগে আক্রান্ত। সে দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। লার্নিং কন্টিনিউটি বা পাঠদানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। ক্লাস হয়নি, তাই পরীক্ষা নিতে হবে কম নম্বরের; এমন চিন্তা বাদ দিতে হবে। সিলেবাস কমানো সঠিক হবে না। কভিডের আগেই শিক্ষার মান বিবেচনায় বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা পিছিয়ে ছিলাম। এখন সিলেবাস কমিয়ে ফেললে সে হার আরও বেড়ে যাবে। শিক্ষার গুণগত মানে মনোযোগ বাড়াতে হবে, যাতে মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কিংবা পরীক্ষার সময়সূচির ব্যাঘাত না ঘটে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা-সংক্রান্ত অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান কার্যকর ও টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিজ অবস্থানে কাজ করতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিক্ষা খাতে অগ্রগতির প্রধান কারণ হলো রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন। আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত, এ বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া এবং দেশের স্বার্থ ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে শিক্ষাব্যবস্থা রাজনীতিমুক্ত করা এবং কোনো জট না হয়; সে লক্ষ্যে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া।