শিল্পঋণ কমেছে ১৬ শতাংশ: ব্যাংক ঋণের ৫৮ শতাংশ যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে

সোহেল রহমান: দেশে বিনিয়োগে এক ধরনের মন্দা চলছে। গত দুই বছরে ব্যাংকিং খাতে শিল্প ঋণের চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে। তবে চাহিদা কমলেও এককভাবে শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ সবচেয়ে বেশি। এর পরে রয়েছে ট্রেডিং (পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা) খাত, আমদানি ঋণ, নির্মাণ খাত ও ভোক্তা ঋণ। সব মিলিয়ে সার্বিকভাবে ব্যাংক ঋণের অর্ধেকেরও বেশি যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে।

বর্তমান সরকারের আমলে গত আট বছরের (২০০৯-১৬) ব্যাংক ঋণের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সালে ব্যাংকিং খাতে শিল্প ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণপ্রবাহের ৩৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সরকারের প্রথম মেয়াদশেষে ২০১৩ সালে এটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশেরও বেশি। পরের বছর (২০১৪) শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ আরও প্রায় তিন শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ৮২ শতাংশ। কিন্তু গত দুই বছর (২০১৫ ও ২০১৬) ধরে ব্যাংকিং খাতে শিল্প ঋণের চাহিদা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশের কিছু কম বা বেশি। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে শিল্প ঋণের চাহিদা কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৩ সালের পর ট্রেডিং, আমদানি, নির্মাণ ও ভোক্তা খাতেও ঋণপ্রবাহ কিছুটা কমেছে। এগুলোর মধ্যে গত বছর (২০১৬) শুধু নির্মাণ খাতে ঋণের হার বেড়েছে। ২০০৯ সালে ট্রেডিং খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণপ্রবাহের ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ। পরে ২০১৩ সালে এটা বেড়ে ২১ শতাংশে দাঁড়ালেও গত দুই বছর ধরে এটা কমছে। গত বছর (২০১৬) এ ঋণের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

একইভাবে ২০০৯ সালে ব্যাংকিং খাতে আমদানি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণপ্রবাহের ১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। পরে ২০১৩ সালে এটা বেড়ে ১৩ দশমিক ১৩ শতাংশে দাঁড়ালেও গত দুই বছর ধরে এটা কমছে। গত বছর (২০১৬) আমদানি ঋণের হার কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ।

নির্মাণ খাতে ২০০৯ সালে ঋণপ্রবাহের হার ছিল ছয় দশমিক ৮৫ শতাংশ। তখন শহরকেন্দ্রিক ব্যক্তিপর্যায়ে ঋণ বিতরণের হার বেশি ছিল। পরে হাউজিং কোম্পানিগুলোতে ঋণ বিতরণের হার বাড়তে থাকে। ২০১২ সালে নির্মাণ খাতে ঋণ বিতরণের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। পরবর্তী তিন বছরে নির্মাণ খাতে ঋণপ্রবাহের হার সামান্য কমে যায়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে নির্মাণ খাতে ঋণ বিতরণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।

অন্যদিকে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ব্যাংকিং খাতে ভোক্তা ঋণের সরবরাহ ছিল মোট ঋণপ্রবাহের যথাক্রমে ছয় দশমিক ৬৭ শতাংশ ও আট দশমিক ৮৯ শতাংশ। পরে গত দুই বছর ধরে এই হার সামান্য পরিমাণে কমছে। গত বছর (২০১৬) ভোক্তা ঋণের হার দাঁড়িয়েছে আট দশমিক ৩৭ শতাংশ।

এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে কৃষি খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ মাত্র পাঁচ শতাংশ। মৎস্য ও বনায়ন খাতে ঋণপ্রবাহ এক শতাংশেরও কম। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ঋণ বিতরণের হার দুই শতাংশের কিছু বেশি। আর শেয়ার ব্যবসায় ব্যাংক ঋণের হার ২০১৪ সালে ছিল দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত দুই বছর ধরে এই হার আরও কমছে। ২০১৬ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে দশমিক ১৯ শতাংশে।

সর্বাধিক ঋণ যাচ্ছে বৃহৎ শিল্পে: ব্যাংকিং খাতের গত আট বছরের ঋণপ্রবাহ পর্যালোচনায় দেখা যায়, মেয়াদি ও চলতি মূলধন (আমদানি-রফতানি ছাড়া) ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই দেশের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতেই ঋণপ্রবাহের পরিমাণ বেশি। এরপরই রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণপ্রবাহের হার দুটো (মেয়াদি ও চলতি মূলধন ঋণ) মিলে প্রায় ২১ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। কুটির শিল্পে এই হার এক শতাংশেরও কম। অন্যদিকে সেবা খাতে ঋণ বিতরণের হার বাড়ছে। বর্তমানে এই খাতে ঋণপ্রবাহের হার প্রায় ছয় শতাংশ।