সাধন সরকার: শিশুশ্রম জাতির জন্য অভিশাপ। শিশুদের সঙ্গে কখনও শ্রম শব্দটি যুক্ত হওয়া উচিত নয়। কিন্তু দারিদ্র্য নামক ব্যাধি শিশুদের শ্রমে নিযুক্ত হতে বাধ্য করে! প্রত্যেক বয়সি মানুষের কিছু প্রধান ও অপ্রধান কাজ থাকে। শিশু বয়সে শিশুদের প্রধান কাজ হলো লেখাপড়া করা। যে বয়সে শিশুদের বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা যে বয়সে শিশু যদি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয় তাহলে বুঝতে হবে পরিকল্পনায় কোথাও কোনো গলদ আছে! একটি দেশ কতটা উন্নত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দেখে সেটাও পরিমাপ করা যেতে পারে! পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা শিশুকে শিশুশ্রমে নিযুক্ত হতে বাধ্য করে। শিশুশ্রম শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০২২’ এর তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। বেসরকারি সংস্থা ‘কারিতাস বাংলাদেশ’- এর তথ্য বলছে বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। এই পথশিশুদের অর্ধেকের বেশি অবস্থান রাজধানী ঢাকা, বিভাগীয় সিটি করপোরেশন এলাকা ও এর আশপাশে। কোনো পরিবার বা অভিভাবক তার শিশু সন্তানকে শ্রমিক হিসেবে দেখতে চায় না। শিশুরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে শ্রমিক হিসেবে কেন যুক্ত হয়- এর কারণ চিহ্নিত করা দরকার সবার আগে। মূলত পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, দারিদ্র্য, বৈষম্য, অসচেতনতা ও পারিবারিক সংকট শিশুশ্রমের জন্য দায়ী।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সূত্র বলছে, পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিকে শিশু ধরা হয়। এর মধ্যে পাঁচ থেকে ১১ বছরের শিশুরা সপ্তাহে এক ঘণ্টা, ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সি শিশু সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা এবং ১৪ থেকে ১৭ বয়সি শিশুরা সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজ করলে তাকে শিশু শ্রম হিসেবে গণ্য করা হয়। ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬’ অনুসারে, ১৮ বছরের কম কোনো শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা সে কথা বলছে না। মনে হচ্ছে, আইন রয়েছে আইনের জায়গায় আর শিশুশ্রম রয়েছে শিশুশ্রমের জায়গায়। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখের বেশি শিশুশ্রমিক বেড়েছে। শিশুশ্রমের সুনির্দিষ্ট কিছু খাত রয়েছে। যেমন বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি কারখানা, কৃষি খাতে, মোটর গ্যারেজ, লেদ মেশিন, ভাঙানি শিল্পখাতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। অনেক কারখানার মালিকরা শ্রমিক হিসেবে শিশুদের পেতে চায়, কেননা শিশু শ্রমিকের বেতন তুলনামূলক কম! যেসব নিম্ন পর্যায়ের পরিবার থেকে শিশুশ্রমিক হিসেবে আসে সেসব পরিবারে অসচেতনার পাশাপাশি পারিবারিক সংকট কিংবা ন্যূনতম মৌলিক অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। শিশু বয়সে শ্রমিক হিসেবে শিশুদের কাজ করার কথা না। শিশু শ্রমিক বৃদ্ধির পেছনে কোনো একক মন্ত্রণালয়, একক সংস্থা কিংবা একক প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়। একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য সরকার থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। একটি হতদরিদ্র স্কুলগামী শিশুর জন্য সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এছাড়া পারিবারিক সংকট তৈরি হওয়া পরিবারের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদেরও করণীয় রয়েছে। সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের জন্য সরকারের নানাবিধ কর্মসূচি রয়েছে। তাহলে কেন শিশুশ্রম বাড়ছে? দেশের প্রতিটি সেক্টর যদি যার যার কাজ সঠিকভাবে পালন করত তাহলে শিশুশ্রমিক তৈরি হওয়ার কথা নয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে শিশুশ্রমের সঙ্গে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। বেসরকারি তথ্য বলছে, বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সি মোট শিশু জনসংখ্যার ১৯ ভাগ। বাংলাদেশে বর্তমানে শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত সঠিক পরিসংখ্যান নেই বললেই চলে! জাতিসংঘ ২০২১ সালকে ‘আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম নিরসন বছর’ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশও শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে কাজ করলেও শিশু শ্রমের অভিশাপ থেকে কিছুতেই মুক্তি মিলছে না। শিশুশ্রম বন্ধে তৎকালীন সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন কল্পে অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু কভিড মহামারি হঠাৎ সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। বর্তমানে ৪৩টি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নির্ধারণ করে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশকে সব ধরনের শিশুশ্রম থেকে দেশকে মুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
যদি এখনই শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর, পরিকল্পিত ও বাস্তসম্মত পদক্ষেপ না নেয়া যায় তাহলে শিশু শ্রমমুক্ত দেশ গড়া স্বপ্নই থেকে যাবে। ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি-২০১৫’ অনুসারে ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে গৃহকর্মে নিযুক্ত করা যাবে না। কিন্তু এ নিয়ম দারিদ্র্যের কাছে টিকছে কই? শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৯৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে। দরিদ্র শিশুরা বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ, কারখানা, কৃষিকাজ, ভিক্ষাবৃত্তি, পরিবহন শ্রমিক হিসেবে ও বিভিন্ন সেবামূলক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। কারখানা আইনেও শিশুশ্রম নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে কেউ যদি শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে তাহলে অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক দুরাবস্থাও শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ। তবে বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার কারণে শিশুশ্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, মোট শিশুশ্রমের অর্ধেকের জন্য দায়ী জলবায়ুগত দুর্যোগ। উপকূলসংলগ্ন এলাকায় শিশুশ্রম বাড়ছে।
দুর্যোগের কবলে পড়ে দিশেহারা মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় শিশুশ্রমকে ত্বরান্বিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। বোধ করি এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। এটা এমনই এক সামাজিক সমস্যা যেটা আইন করে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়! দেশে শিশুশ্রমিক ও পথশিশুদের সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানা বেশি জরুরি। কেননা সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ হয়। শিশুশ্রমভুক্ত পরিবারগুলোকে অবশ্যই সামাজিক সুরক্ষায় আওতায় আনতে হবে। শিশুশ্রম দেশের উন্নয়নের পথে অন্তরায়। সামাজিক এই সমস্যা এখনই রোধ করা সম্ভব না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের পাশাপাশি সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিশুশ্রম বন্ধে দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকদের সচেতনতা দরকার। সর্বোপরি সামাজিক কর্মসূচির আওতায় জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হবে।




