প্রতিনিধি, শেরপুর: শেরপুরের শ্রীবর্দীতে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্বামী বোরকা পরে অতর্কিতভাবে ধারাল অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে স্ত্রী, শাশুড়ি ও চাচাশ্বশুরকে হত্যা করেছেন। সেইসঙ্গে শ্বশুরসহ আরও তিনজন আশঙ্কাজনকভাবে জখম হয়েছেন। তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ঘাতক মন্টু মিয়াকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
নিহতরা হলেন মন্টুর স্ত্রী মনিরা বেগম, শাশুড়ি শেফালী বেগম ও চাচাশ্বশুর মাহমুদ হাজি। এছাড়া আহতরা হলেন ঘাতকের শ্বশুর মনু মিয়া, স্ত্রীর ভাই মনু মিয়ার ছেলে শাহাদাৎ হোসেন এবং আহাদ আলীর স্ত্রী বাচ্চুনী বেগম।
স্থানীয় মানুষ ও আত্মীয়রা জানান, প্রায় ১৭ বছর আগে জেলার শ্রীবর্দী উপজেলার কাকিলাকুঁড়া ইউনিয়নের খোশালপুর পুটল গ্রামের মনু মিয়ার মেয়ে মনিরা বেগমের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী তাঁতিহাটি ইউনিয়নের গেরামারা গ্রামের হাই মদ্দিনের ছেলে মন্টু মিয়ার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তাদের দাম্পত্য জীবনে নানা কলহের শুরু হয়।
এ কলহ নিয়ে দফায় দফায় মনিরা তার বাবার বাড়ি ফিরে গেলেও পারিবারিক ও স্থানীয় সালিশ-বৈঠক করে মনিরাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতেন মিন্টু মিয়া। কিন্তু এর কিছুদিন পর আবারও বিবাদ-কলহ শুরু হতো এবং মীমাংসা হতো।
সর্বশেষ কয়েক দিন আগে ফের দাম্পত্য কলহের জের ধরে মনিরা তার দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন। মনিরা ও মন্টুর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলে মনিরুজ্জামান অষ্টম শ্রেণিতে এবং মেয়ে মারিয়া আক্তার মিম ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। এবারও মন্টু নানা বাহানা করলেও মনিরার মন গলেনি; সাফ জানিয়ে দেন তিনি আর তার বাড়িতে ফিরে যাবেন না। প্রয়োজনে ডিভোর্স দেবেন মনিরা।
এসব কথা শুনে মন্টু রেগে গিয়ে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় তার শ্বশুরবাড়িতে বোরকা পড়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে ধারালো দা ও ছুরি নিয়ে হামলা চালান। প্রথমে তার স্ত্রীকে রান্নাঘরে ঢুকে দা দিয়ে জবাই করেন। এ সময় তার চিৎকারে শ্বশুর-শাশুড়ি ও অন্য আত্মীয়রা ছুটে এলে যাকে যেখানে পান, সেখানেই তাকে মন্টু কোপাতে থাকেন। একপর্যায়ে তার শাশুড়ি, শ্বশুর, চাচাশ্বশুর ও সম্বন্ধীসহ ছয়জনকে কুপিয়ে পালিয়ে যান মন্টু।
পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে গ্রামের পার্শ্ববর্তী জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে নেয়ার পথে ঘাতকের স্ত্রী মনিরা মারা যান এবং বক্সিগঞ্জ হাসপাতালে নেয়ার পর ঘাতকের শাশুড়ি ও চাচাশ্বশুর মারা যান। এদিকে রাতেই ঘাতক মন্টুর শ্বশুর মনু মিয়াকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় এবং আহত অন্য দুজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ বিষয়ে মন্টুর মেয়ে মারিয়া আক্তার মিম জানায়, প্রায়ই তার বাবা তার মাকে মারধর করতেন। ফলে তার মা তার নানির বাড়ি চলে আসতেন। তাদের পড়াশোনার খরচ ও পরিবারের খরচও দিতে চাইতেন না তার বাবা। এখানে আসার পর তাকে ও তার ভাই যাতে স্কুলে যেতে না পারে, সেজন্য তাদের বই নিয়ে আসতে দেননি তার বাবা। ঘটনার সময় মিম ঘরে থেকেই তার মায়ের চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসে দেখে তার বাবা তার নানি ও নানাকে কোপাচ্ছেন। পরে তার এক মামা তাকে বাঁচাতে তাকে ধরে অন্য ঘরে নিয়ে যান।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে শেরপুর জেলার পুলিশ সুপার হাসান নাহিদ চৌধুরী, শ্রীবর্দী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপ্লব বিশ্বাসসহ পুলিশের অন্যান্য বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্যরা শ্রীবর্দীতে অবস্থান নেন এবং আসামিকে গ্রেপ্তার করতে তৎপর হন।
অবশেষে ভোররাতে ঘাতকের শ্বশুরবাড়ির পাশের একটি আমগাছ থেকে মন্টুকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ঘাতক মন্টু রাতে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ না পেয়ে রাতভর গাছে চড়ে ছিলেন নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে। কিন্তু সারারাত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও লোক সমাগম বেড়ে যাওয়ায় তিনি গাছ থেকে নেমে পালাতে পারেননি। পরে গতকাল ভোরে ডিবি পুলিশ তাকে গাছ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করে।
এ ঘটনায় শ্রীবর্দী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে আমরা রাত থেকেই আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসি এবং ভোররাতে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। মামলা ও পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।’



