Print Date & Time : 15 May 2026 Friday 1:24 pm

সংকট-সম্ভাবনায় ধুঁকছে তাজমা সিরামিক

পারভিন লুনা, বগুড়া : তাজমা সিরামিক। শুধু একটি কারখানার নাম নয়, বরং বগুড়ার মাটি আর শ্রমিকদের হাতের স্পর্শে তৈরি বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের সূচনালগ্নেরও প্রতিচ্ছবি। ১৯৫৮ সালে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বহু চড়াই-উতরাই দেখেছে। একসময় তৎকালীন পাকিস্তানের আনাচে-কানাচে তাদের উৎপাদিত চীনামাটির বাসনকোসন ও তৈজসপত্রের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে ফার্নেস অয়েলের সংকটে জর্জর হয়ে ২০০১ সালে তাজমা সিরামিক কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়, যা এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাময়িক পতন। প্রায় আট বছর নীরব থাকার পর ২০০৯ সালে গ্যাস সংযোগের পর আবারও জেগে ওঠে তাজমা সিরামিক। চীনের কারিগরি সহায়তায় নতুন আঙ্গিকে পথচলা শুরু করে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। পুরোনো দিনের সেই পরিচিত পণ্যের পাশাপাশি যোগ হয় আধুনিক ডিজাইন ও প্রযুক্তির ছোঁয়া। এখন সংকট সম্ভাবনা পুঁজি করে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে তাজমা সিরামিক।

জানা গেছে, বর্তমানে প্লেট, কাপ, গ্লাস, জগ, মগ, বাটি থেকে শুরু করে ফুলদানি ও শোপিসের মতো প্রায় ৬০ ধরনের সিরামিক পণ্য তৈরি করছে তাজমা। বছরে প্রায় ১২ কোটি টাকার বাজার সৃষ্টি করে, এই কারখানাটি শুধু বগুড়ার নয়, দেশের অর্থনীতিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। প্রায় ২৫০ কর্মীর জীবিকা এই কারখানার ওপর নির্ভরশীল, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বর্তমান কর্ণধার মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান এই প্রতিষ্ঠানের উত্থান-পতনের জীবন্ত সাক্ষী। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অল্পকথায় বললে বর্তমানে অস্তিত্ত্ব সংকটের মুখে রয়েছে। চলতি মূলধন সংকট, পুরনো কারখানা, আধুনিকায়নের অভাবে ফার্নেস অয়েলের বদলে পুরোপুরিভাবে গ্যাস ব্যবহার করতে না পারাসহ বেশকিছু কারণে অনেক সংকটের মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে। তারপরও প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করছি। সরকারের সহযোগিতা পেলে তাজমা সিরামিক সংকট কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’

তাজমা সিরামিকের পেছনের গল্প প্রেরণাদায়ক। নওগাঁর রানীনগরের খাজুরিয়াপাড়া গ্রামের আবদুল জব্বার অভাবের তাড়নায় চল্লিশের দশকে কাজের সন্ধানে বগুড়া শহরে পাড়ি জমান। পড়াশোনার সুযোগও পানি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে প্রথমে ভাণ্ডারি বিড়ি ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের কাজ নেন। এরপর নিজের চেষ্টায় পুঁজি সংগ্রহ করে দেশভাগের আগে গ্রামে ফিরে যান, তিন ভাইয়ের সহায়তায় শুরু করেন বিড়ির কারখানা। তাদের তৈরি ‘কল্যাণবিড়ি’ ও ‘পাক বিড়ি’ অল্প সময়েই উত্তরবঙ্গে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

বিড়ি ব্যবসার সাফল্যের পর আবদুল জব্বার আরও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বিড়ির ব্যবসার লাভের টাকা বিনিয়োগ করে সিরামিক কারখানা স্থাপন করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে বগুড়া শহরের কলোনি বাজারে চার ভাইয়ের মালিকানায় পথচলা শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সিরামিক কারখানা ‘তাজমা’। চার ভাইয়ের ইংরেজি নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে গঠিত এই লিমিটেড কোম্পানিটির প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেন আবদুল জব্বার। কঠোর পরিশ্রম ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি একটি নতুন শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করেন।

আবদুল জব্বার শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, বরং একজন স্বপ্নদ্রষ্টাও ছিলেন। তিনি শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেননি, বরং পূর্ব পাকিস্তানে একটি নতুন শিল্পের সূচনা করেছিলেন। তার দূরদর্শিতা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তাজমা সিরামিক দীর্ঘকাল ধরে টিকে আছে এবং দেশের সিরামিক শিল্পের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।

বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ডলার সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন দেশের অন্যান্য শিল্পের মতো সিরামিক শিল্পকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাজমা সিরামিকও এর ব্যতিক্রম নয়। কোম্পানিটিকে টিকিয়ে রাখতে মূলধন সংকট দূর করা ও আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান। তিনি আরো বলেন, ‘সিরামিক শিল্পের প্রসারে কাঁচামাল আমদানিতে সরকারি ভর্তুকি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য।

বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশাল সিরামিক বাজারে তাজমা সিরামিক হয়তো অন্য বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মতো দাপটের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না, কিন্তু তাজমার দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গুণগত মান কোম্পানিটিকে শক্ত একটি ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে। এ কারণে বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিজ অবস্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তাজমা সিরামিক।

শ্রমিক থেকে শিল্পপতি হওয়ার আবদুল জব্বারের স্বপ্ন আজও বহন করে চলেছে তাজমা সিরামিক। কালের সাক্ষী হয়ে ঐতিহ্য আর সংকটের দোলাচলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি শুধু একটি উৎপাদন ইউনিট নয়, বরং দেশের শিল্পায়নের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।