সাড়ে তিনগুণ ব্যয়ের পায়রা সেতু উদ্বোধন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: অবশেষে আজ খুলে দেয়া হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত পায়রা সেতু। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেতুটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেতুটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ভুল পরিকল্পনা ও দফায় দফায় সংশোধনের কারণে দেড় কিলোমিটারেরও কম দৈর্ঘ্যরে পায়রা সেতু নির্মাণে সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে ৯ বছর। আর ব্যয় বেড়ে হয়েছে সাড়ে তিনগুণ।

সূত্রমতে, পায়রা নদীর ওপর ১ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু চালু হলে মানুষ বরিশাল শহর থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে পটুয়াখালী জেলা সদর এবং নির্মাণাধীন পায়রা সমুদ্রবন্দরে যেতে পারবে। মাত্র দুই ঘণ্টায় জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায়ও যাওয়া যাবে। তবে ভুল পরিকল্পনার কারণে পাঁচ বছরের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এরই মধ্যে চার দফা সময় বৃদ্ধি করতে হয়েছে। আর নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পায় প্রায় এক হাজার ৩৪ কোটি টাকা।

তথ্যমতে, পায়রা সেতু নির্মাণে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রথমে অনুমোদন করা হয় ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা। তবে পরিকল্পনায় যে পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের কথা ছিল বাস্তবে তার চেয়ে বেশি দরকার পড়ে। এজন্য ২০১৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটি বিশেষ সংশোধন করা হয়। সে সময় এ ব্যয় কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

নকশা প্রণয়নের সময় প্রকল্পটিতে বেশকিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। এতে সেতুটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ২৭৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের জুন মাসে এ জন্য প্রকল্পটি এক দফা সংশোধন করা হয়। এরপর আর ঠিকাদার নিয়োগের পর আরও কিছু সংশোধন আনতে হয় প্রকল্পটি। ফলে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটি আরেক দফা সংশোধন করা হয়। এতে ব্যয় আরও বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৪৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তিনগুণ।

এদিকে প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতার ফলে সেতুর নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘসূত্রিতা ও সাম্প্রতিক কভিড পরিস্থিতির কারণে সেতুটির নির্মাণকালও চার দফা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া নির্মাণকাজ শেষ হলেও নির্মাণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রকল্পটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে চার দফায় সেতুটির মেয়াদকাল বাড়ানো হয়েছে প্রায় সাত বছর।

সূত্র জানায়, ২০২০ সালের জুনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত প্রকল্পটির ‘ইন-ডেপথ মনিটরিং রিপোর্টে’ সময়মতো জমি অধিগ্রহণে ব্যর্থতা এবং ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক ও পরামর্শক পরিবর্তনকে প্রকল্পের দুর্বল দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নকশায় পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরামর্শক নিয়োগব্যয় বৃদ্ধিকে প্রকল্প ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সওজের এক প্রকৌশলী প্রকল্পটি প্রসঙ্গে জানান, অনুমোদনের আগে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও তা ভালোভাবে করা হয়নি। ফলে পরামর্শক নিয়োগের পর বিস্তারিত নকশা প্রস্তুত করতে গিয়ে নকশায় অনেক পরিবর্তনে আনতে হয়। এছাড়া প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে জমি অধিগ্রহণ নিয়েও জটিলতার মুখোমুখি হয়। ২০২০ সালে এসে পুরো জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হয়।

জানতে চাইলে পায়রা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল হালিম শেয়ার বিজকে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্প ব্যয় একটি ধারণাগত নকশার ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু পরে বিস্তারিত নকশা অনুসারে প্রকৃত নির্মাণব্যয় চূড়ান্ত করা হয়। ফলে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া পাইলের নকশা পরিবর্তন ও দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির ফলেও ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

প্রসঙ্গত, পায়রা সেতুর বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। আর চীনা প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ কনস্ট্রাকশন সেতুটি নির্মাণ করেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট যৌথভাবে এক হাজার ৭৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে। আর ৩৬৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।

বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে নির্মিত পায়রা (লেবুখালী) সেতু

এদিকে ফেরির ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে সাড়ে সাতগুণ বেশি হারে টোল নির্ধারণ করা হয়েছে পায়রা সেতুতে। এক্ষেত্রে ফেরি পারাপারে ভারী ট্রাকের চার্জ ছিল ১০০ টাকা। সেখানে পায়রা সেতুতে টোল নির্ধারিত হয়েছে সাড়ে ৭ গুণ বেশি তথা ৭৫০ টাকা। আর বড় বাসের ফেরি ভাড়া ছিল ৯৫ টাকা। সেতুতে তা নির্ধারিত হয়েছে ৩৪০ টাকা, যা সাড়ে তিনগুণ বেশি। মাইক্রোবাসের ৪০ টাকার ফেরি ভাড়া হয়েছে ১৫০ টাকা, যা পৌনে চারগুণ বেশি।

সেতুটিতে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী অন্যান্য বাহনের মধ্যে ট্রেইলারের টোল ৯৪০ টাকা, মাঝারি ট্রাকে ৩৭৫ টাকা, ছোট ট্রাকে ২৮০ টাকা, কৃষিকাজে ব্যবহƒত যানে ২২৫ টাকা, কোস্টারে ১৯০ টাকা, চার চাকার মোটরযানে ১৫০ টাকা, সেডান কারে ৯৫ টাকা, ৩-৪ চাকার যানে ৪০ টাকা, মোটরসাইকেলে ২০ টাকা এবং রিকশা, ভ্যান, সাইকেল ও ঠেলাগাড়িতে ১০ টাকা।

যদিও ওই সেতুর নিচে ফেরি দিয়ে নদী পারাপারে ভাড়া ছিল ট্রেইলারে ৩৭৫ টাকা, মাঝারি ট্রাকে ৯৫ টাকা, ছোট ট্রাকে ৯৫ টাকা, কৃষিকাজে ব্যবহƒত যানে ৯০ টাকা, কোস্টারে ৫০ টাকা, চার চাকার মোটরযানে ৪০ টাকা, সেডান কারে ২০ টাকা, ৩-৪ চাকার যানে ১০ টাকা, মোটরসাইকেলে ৫ টাকা এবং রিকশা, ভ্যান, সাইকেল ও ঠেলাগাড়িতে ৫ টাকা।