গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট

সিরামিক কোম্পানিগুলোর উৎপাদন কমেছে ৫০%

হামিদুর রহমান: দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে পড়ায় সিরামিক কোম্পানিগুলোর উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চলতি মাসে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। বেশ কয়েকদিন ধরে সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও ময়মনসিংহসহ প্রায় ১৮টি সিরামিক তৈজসপত্র, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিরামিক কারখানায় যেখানে ১৫ পিএসআই (পাউন্ডস পার স্কয়ার ইঞ্চি) প্রেসার প্রয়োজন হয়, সেখানে গ্যাসের প্রেসার কখনও কখনও ২-৩ পিএসআই থেকে শূন্যের কোঠায় পর্যন্ত নেমে আসছে। যার প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। 

ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এভাবে চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানির উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কেননা সিরামিক কারখানায় পণ্য প্রস্তুতে চুল্লিতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ থাকতে হয়। সেই হিসেবে এ শিল্পে গ্যাস একটি অন্যতম কাঁচামাল। পণ্য উৎপাদনে ১০-১১ শতাংশ খরচই হয় গ্যাসের পেছনে।

ফার সিরামিক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংকটে সিরামিক খাত। এ খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ছাড়া উৎপাদন অসম্ভব। বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটে ইতোমধ্যে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস না থাকায় পণ্যের গুণগতমান ঠিক রাখা যাচ্ছে না। অনেক পণ্য নষ্ট হচ্ছে। কারণ নির্দিষ্ট টেম্পারেচার (তাপমাত্রা) ছাড়া পণ্য উৎপাদন করা যায় না। আর নির্দিষ্ট টেম্পারেচারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ থাকতে হয়। লোডশেডিং ও গ্যাস না থাকায় কোম্পানিগুলো এখন প্রোডাকশন করতে গিয়ে লোকসানে পড়ছে।

জানা যায়, সিরামিক কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও চিঠি চালাচালি করেও কোনো সমাধান মিলছে না। গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন। তবে চিঠিরও কোনো উত্তর মেলেনি। 

চিঠিতে বলা হয়, বিগত ৩ মাসেরও অধিককাল সময় ধরে ঢাকা জেলার সাভার, ধামরাই, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ, মেঘনাঘাট, গাজীপুর জেলার কাশিমপুর, ভবানীপুর, ভাওয়াল মির্জাপুর, শ্রীপুর, মাওনা ও নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা, ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা ও ত্রিশাল এবং হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর ও বাহুবল এলাকায় অবস্থিত প্রায় ২৫টি সিরামিক তৈজসপত্র, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিরামিক কারখানায় যেখানে কমপক্ষে ১৫ পিএসআই প্রেসার প্রয়োজন হয়, সেখানে গ্যাসের প্রেসার কখনও কখনও ৩-৪ পিএসআই থেকে শূন্যের কোঠায় পর্যন্ত নেমে আসছে। বিশেষ করে গত প্রায় ১৫ দিন ধরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা এক টানা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত, এমনকি একটানা কয়েকদিন পর্যন্তও সরবরাহ বন্ধ থাকছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, সিরামিক শিল্প একটি গ্যাসনির্ভর প্রসেস ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি। পণ্যের মোট উৎপাদন ব্যয়ের ১২ শতাংশের গ্যাস খাতে ব্যয় হয়। এ শিল্পের মেশিনারিজের বৈশিষ্টগত কারণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। পণ্য প্রস্তুত করতে কিলন বা চুল্লিতে ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ থাকতে হয়। সিরামিক পণ্য পোড়াতে কিলন এ ক্ষেত্র বিশেষ ৯০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে ১৪০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত তাপমাত্রায় ফায়ারিং করা হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার (কমপক্ষে ১৫ পিএসআই) প্রেসার ছাড়া কোনোভাবেই চুল্লির অভ্যন্তরে উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। সিরামিক কারখানায় গ্যাসের প্রয়োজনীয় প্রেসার কমে গেলে কিলনের অভ্যন্তরে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় থাকা সব পণ্য তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়ে যায় এবং ফায়ারিং লাইনে অপেক্ষমাণ থাকা গ্রিন বডিও নষ্ট হয়ে যায়। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও বন্ধ কিলন পুনরায় চালু করতে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে।

এ অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহের ফলে পণ্য এবং কিলনের মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন করতে না পারায় পণ্য সরবরাহ বিঘœ ঘটছে। যে কারণে বিশ্ব বাজারের নামিদামি কোম্পানিগুলো অর্ডার বাতিল করে দিচ্ছে এবং স্থানীয় বাজারেও নিয়মিত সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ফলে কোম্পানিগুলো আর্থিক ক্ষতির কারণে সময়মতো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে অনেক প্রতিষ্ঠান। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকের বেতন-ভাতা প্রদান ও কাঁচামালের জোগান দেয়াও দুরূহ হয়ে পড়বে।     

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সর্বশেষ তথ্যমতে, ‘সিরামিক কোম্পানিগুলোর প্রতিবছর উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছেÑপ্রায় সাড়ে ৫২ কোটি পিস। এর মধ্যে টাইলস রয়েছে ২০ কোটি ৭০ লাখ পিস, স্যানিটারিওয়্যার এক কোটি ছয় লাখ পিস, টেবিলওয়্যার ৩০ কোটি ২০ লাখ পিস।

আর সিরামিকের মার্কেট রয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এর মধ্যে টাইলস ছয় দশমিক ৩৩ কোটি ডলার, স্যানিটারিওয়্যার এক দশমিক ৮০ কোটি ডলার ও টেবিলওয়্যার সাড়ে সাত কোটি ডলার ।

বিসিএমইএ তথ্যানুযায়ী, সিরামিক খাতে বর্তমানে ৭০টি প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে তৈজসপত্রের ২০টি, টাইলসের ৩২টি ও স্যানিটারি পণ্য উৎপাদনের ১৮টি কারখানা।