চীন-রাশিয়ার কঠিন শর্তের ঋণের প্রভাব

সুদহার বাড়ছে বিদেশি ঋণের কমছে পরিশোধের সময়

ইসমাইল আলী: কয়েক বছর ধরে সরকারের বিদেশি ঋণ বাড়ছে দ্রুত। এর মধ্যে চীন, রাশিয়ার কঠিন শর্তের ও উচ্চ সুদের ঋণ অন্যতম। এসব ঋণের কারণে সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের গড় সুদহার বেড়ে যাচ্ছে। গত চার বছরে বিদেশি ঋণের সুদহার পৌনে দুইগুণ হয়েছে। পাশাপাশি চীনের ঋণে রয়েছে সার্ভিস চার্জ। এছাড়া চীন ও রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের সময়কালও তুলনামূলক কম। ১৫-২০ বছরে এসব ঋণ শোধ করতে হবে। ফলে সার্বিকভাবে সরকারের বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছর সরকারের বিদেশি ঋণের ভারিত গড় সুদহার ছিল এক দশমিক ৩০ শতাংশ। পরের অর্থবছর তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় এক দশমিক ৩৫ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছর এ সুদহার আরও বেড়ে হয় দুই দশমিক ১১ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছর দুই দশমিক ২৭ শতাংশ।

এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছর সরকারের বিদেশি ঋণ শোধের গড় সময়কাল ছিল ১১ দশমিক ৩ বছর। পরের অর্থবছর তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১১ বছর। ২০২১-২২ অর্থবছর তা শোধের সময় আরও কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছর ৮ দশমিক ৯ বছর। অর্থাৎ সুদহার বাড়ার পাশাপাশি ঋণ শোধের সময়কালও কমেছে দুই দশমিক ৪ বছর। সুদহার বাড়া ও সময়কাল কমায় প্রভাব পড়েছে ঋণ পরিশোধের ওপর।

ইআরডির তথ্যমতে, গত অর্থবছর সরকারের ঋণ পরিশোধের (আসল ও সুদ) পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৭৯ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬১০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবছর বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১ দশমিক ১৬৯ বিলিয়ন ডলার বা ৩২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গত অর্থবছর ঋণ শোধের মধ্যে আসল ছিল ৩ দশমিক ৪৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছর ছিল ২ দশমিক ৯৫৪ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে আসল পরিশোধ বেড়েছে ৫১৯ মিলিয়ন ডলার বা ১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

অন্যদিকে, গত অর্থবছর সরকারকে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয় ১ দশমিক ৩০৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৬৫৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সুদ পরিশোধ ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ইআরডির হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছর সরকারের ঋণ শোধের পরিমাণ ছিল (ডেট সার্ভিসিং) রাজস্ব আয়ের পাঁচ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ১৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি ঋণের গড় সুদহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ চীন ও রাশিয়ার কঠিন শর্তের ঋণ। এর মধ্যে চীনের বেশিরভাগ ঋণের সুদহার দুই থেকে তিন শতাংশ। এর সঙ্গে সার্ভিস চার্জ রয়েছে দশমিক ২০ থেকে দশমিক ২৫ শতাংশ। এর ঋণ পরিশোধের সময়কাল ১৫ বছর, যার মধ্যে গ্রেস পিরিয়ড মাত্র চার বছর।

রাশিয়ার ঋণের সুদহার ছয় মাস মেয়াদি লাইবর+১.৭৫ শতাংশ। বর্তমানে ছয় মাস মেয়াদি লাইবার হার (লন্ডন আন্তঃব্যাংক অফার রেট) পাঁচ দশমিক ৬০ শতাংশ। এতে রাশিয়ার ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ ঋণ পরিশোধের সময়কাল ২০ বছর, যার মধ্যে গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর।

প্রসঙ্গত, ২০২১-২২ অর্থবছর বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ ছিল বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের চার দশমিক ৫৯ শতাংশ। তবে গত অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ দশমিক ৮১ শতাংশ। যদিও এ হার এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার চেয়ে অনেক নিচেই রয়েছে বলে মনে করছে ইআরডি।