মোহাম্মদ আবু নোমান: আমাদের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন কমিশনে নতুন মানুষ। কোথায়, কখন কী বলতে হবে হয়তো এখনও বুঝে উঠতে পারেননি বা পরিপক্ব হননি! এর আগের নির্বাচনগুলোয় রাতের ভোটসহ নানা কেলেঙ্কারির পরও সিইসিরা বলেছেন, নির্বাচন সুপ্ত ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। দু-একটা কেন্দ্রে সামান্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে, যা তেমন কিছুই নয়।’
গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ায় গত ১২ অক্টোবর শূন্য আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে সিসিটিভির মাধ্যমে বৃহৎ পর্দায় কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। শুরুতে তারা যেখানেই অনিয়ম দেখেছেন, সে কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেছেন। এভাবে একে একে ৫০টি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেও সামাল দিতে না পেরে, শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করে সিইসি বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হয়েছে, ভোট গ্রহণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কোনো একটি পক্ষ বা কোনো একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রভাবিত করতে পারছেন। ফলে, আমাদের দৃষ্টিতে মনে হয়েছে, ভোট গ্রহণ নিরপেক্ষ হচ্ছে না।’
একটি আসনে ভোট করতে গিয়ে এই অবস্থা, ৩০০ আসনে ভোট হলে কী হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘এটা সময় বলে দেবে। এখন একটি আসনে সঠিক হচ্ছে না বলে ৩০০ আসনে হবে না, সেটি বলা সমীচীন হবে না। এই নির্বাচন থেকে আমরা কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে পারব।’ একটি আসনে নির্বাচন, যদিও উপনির্বাচন, তাও বিএনপি যে নির্বাচনে নেই, সেটাই যখন সুষ্ঠুভাবে করা গেল না, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে নির্বাচন বন্ধ করা হলো। অথচ তিনি ৩০০ আসনের নির্বাচন সঠিকভাবে করতে পারবেন না বলে স্বীকার করেননি। আগের দুই সিইসির মতোই আশাবাদী বক্তব্য রাখলেন।
অনেক বছর ধরে দেশে নির্বাচন মানেই ছিল, একতরফা বিজয় আর প্রকাশ্যে জাল-জালিয়াতির ঘটনা। আগের দুই কমিশন কাজী রকিবউদ্দীন এবং কে এম নূরুল হুদার অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও স্থানীয় সব ধরনের নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব আমলে নেয়া দূরের কথা; তারা অনেক ক্ষেত্রে লুকানোর চেষ্টা করেছেন, যা দুই অকর্মণ্য কমিশনের মহাকাব্যিক ব্যর্থতার কীর্তি ইতিহাস হয়ে থাকবে। একটি উপনির্বাচন যখন নিয়ন্ত্রণে থাকল না, সামনের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয়তো ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে’। তখন আগের দুই অকর্মণ্য কমিশনের মতোই বলতে হবে পরিস্থিতি কেন, কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, পরে বলব। কারা এসব করল, এখনই বলতে পারব না, পরে বলব। কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, বলতে পারব না, পরে বলব। যেমনিভাবে কুমিল্লাতেও সামলাতে পারেননি। তারপর দিন শেষে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালই বলবেন, অনুসন্ধানে জানা গেছে, সামান্য কিছু সমস্যা ছাড়া ভোট সুপ্ত হয়েছে। গাইবান্ধার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে বা হারলেও যেখানে সরকারের কিছুই যাবে-আসবে না, সেখানেই যদি এরকম ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে, তাহলে ৩০০ আসনের নির্বাচন, যাতে সরকার পরিবর্তন হবে, সেখানে কী রকম ভয়াবহ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটবে তা বোঝার জন্য পণ্ডিত হতে হয় না।
ইসি, জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দল, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল ইসির নয়। গাইবান্ধা উপনির্বাচনে এই সম্মিলিত প্রয়াস দেখা যায়নি। মাঠ প্রশাসন ইসির নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ফলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে পাওয়া অভিযোগের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয়নি। যাদের কারণে নির্বাচনটি পণ্ড হয়েছে এবং যারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। মাঠ প্রশাসন সহযোগিতা না করলে ইসির পক্ষে নির্বাচন তুলে আনা সম্ভব নয়। গাইবান্ধায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির সক্ষমতা ও দৃঢ়তা নিয়েই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসার ও পুলিশ অনিয়মকারীদের গাইড করে কেন্দ্রের ভেতরে নিয়ে গেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে ইসির পক্ষে ভোট বন্ধ করা ছাড়া আর কী করার থাকতে পারে? সিসিটিভি ভেঙে ফেলা এবং সংযোগ কেটে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। গাইবান্ধায় রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় চলে গিয়েছিল।
সাংবিধানিকভাবে ভোটের সব দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু ভোটকেন্দ্র সরাসরি পরিচালনা করার মতো জনবল তাদের আছে কী? প্রশাসনের অসহযোগী মনোভাবের ওপর ইসি কিছু করতে পেরেছে বলে এ যাবৎ কোনো প্রমাণ নেই। কারণ হিসাবে বলা যায়, ক্ষমতাসীনরা বরাবর প্রশাসনকে আশকারা দিয়ে থাকে। ক্ষমতাসীনরা যখন জয়লাভের জন্য শপথ ভুলে মরিয়া হয়ে উঠে, তখন প্রশাসন চাকরি রক্ষার ভয়ে জবুথবু হয়ে দায়িত্ব পালন করে থাকবে। বাংলাদেশের কারবার হলো, এসপি/ডিসিদের ক্যারিয়ার নির্ভর করে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের ওপর। যদি আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা টিকে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা খুব ভালো সুবিধায় ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে পারবেন। সবাই ক্ষমতাসীনদের সাপোর্টের ছিলেন বলে দাবি করে লোভনীয় পদে পোস্টিং নেবেন। তারা ধারণা করে, বিএনপি এলে অনেকেরই ওএসডি হবে. কারও চাকরিও চলে যেতে পারে।
গাইবান্ধায় নির্বাচন কমিশন যখন কয়েকশ মাইল দূর থেকে সিসিটিভি দেখে একের পর এক ভোটকেন্দ্র বন্ধের ঘোষণা করছে, তখন নিকটবর্তী থেকে স্থানীয় প্রশাসন ছিল নিষ্ক্রিয়। এমনকি ভোটকেন্দ্রে অরাজকতা সম্পর্কে জ্ঞাত করার পরও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি। দুর্বৃত্তরা কিছু কিছু কেন্দ্রে সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। শুধু সদ্য বাতিল এই নির্বাচন নয়, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী অধিকাংশ নির্বাচনেই মাঠ প্রশাসন এভাবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের হয়ে কাজ করেছে। আমরাতো মনে করি, ভোট ডাকাতরা সংখ্যায় যতই হোক উপস্থিত প্রশাসনের সামনে কিছুই নয়।
গাইবান্ধা-৫ আসনে উপনির্বাচন বাতিল হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রধান বিরোধী দল ছাড়া একটি আসনে ভোটগ্রহণে এমন গলদঘর্ম ও লেজেগোবরের সঙ্গে নাকানি-চুবানি অবস্থা। খালি মাঠেই এমন হলে ৩০০ আসনের ভরা মাঠে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? তখনতো মাঠ চলে যাবে বলের বাইরে! ইসি কীভাবে তা সামাল দেবে? ইতিহাসে কথিত আছে, মহাভারত রচনার প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে (বর্তমান) গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় বিরাট রাজার রাজধানী ছিল। বিরাট রাজার প্রায় ৬০ হাজার গাভী ছিল। ঘাঘট নদীর তীরবর্তী এ ভূখণ্ড (বর্তমান গাইবান্ধা শহর) ছিল তার রাজত্বভুক্ত পতিত তৃণভূমি। তিনি এই তৃণভূমিকে গোচারণ ক্ষেত্র ও গাভীর বাথান হিসেবে ব্যবহার করতেন। এখানে গাভীগুলো বাঁধা থাকত, বাঁধার স্থান হিসেবে গাইবান্ধা নামটি এসেছে বলে কিংবদন্তি রয়েছে। কথার কথা, গাইবান্ধা যখন খুঁটিতে কিন্তু দড়ি ছিঁড়ে ফেলায় পুরো গোয়াল ঘরটিই বন্ধ করে দিতে হলো? একটা গাই সামলাতেই এই অবস্থা, বাকি ২৯৯ সংসদীয় আসনতো মহীরূপে ‘ষাঁড়’ হিসেবে আবির্ভাব হলে সিইসি কীভাগে বাগে রাখবেন?
দলীয় সরকারের কোনো প্রার্থী-ই পরাজয় মেনে নেবে কী? সব কেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় আনা এবং তা সর্বক্ষণ মনিটর করাও কমিশনের পক্ষে দুরূহ হবে। যারা এই প্রশ্ন করছেন যে নির্বাচন কমিশন একটা আসনে পারেনি, ৩০০টিতে কী করে পারবে। প্রশ্নটা নির্বাচন কমিশন পারবে কি না সেটা নয়, বরং নির্বাচন কমিশন চাইবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা ইসির সাংবিধানিক দায়িত্ব-এই উপলব্ধি থেকে গাইবান্ধায় ইসি ভোট বাতিল করে থাকলে তা সঠিক পদক্ষেপ বলে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় যেটা ব্যাপক প্রচার হয়েছে তা হলো, গাইবান্ধায় নির্বাচন কমিশন বিশ্বাস করাতে চাইছে যে, তারা কত পাওয়ারফুল। বিদেশি চাপে এবং সামনে জাতীয় নির্বাচনের ইমেজ বাড়াতে এই কৌশল। ইসি, ইভিএম এবং সিসি ক্যামেরায় আস্থায় আনার অভিনব কৌশল! আবার কেউ কেউ মনে করছে, পাতানো গেম; বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা, লক্ষ্য বিএনপিকে ক?্যামোফ্লেজ করা। ভোট বন্ধ করে এটা বোঝাতে চাচ্ছে যে উনি আগামী ইলেকশনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন। পরিকল্পনা করে ইসির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো হচ্ছে। যাতে করে ইসির প্রতি বিরোধী দলের আস্থা ফিরে আসে। খোদ বিএনপি নেতারা মনে করছেন- সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ফাঁদ পেতেছে ইসি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও সাধারণ মানুষের কাছে ইসির বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক আগেই তলানিতে পৌঁছে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি শক্তিশালী করার কথা অতীতে বারবারই বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো দলই তা করেনি। এমনকি আজ বিএনপি যে সংবিধানের দোহাইয়ের গ্যাড়াকলে পড়েছে, সে বিএনপিও বলেছিল, ‘শিশু ও পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়’।
ভোটগ্রহণের পর অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন বাতিল করার চেয়ে ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম দূর করা বেশি জরুরি। আর এক্ষেত্রে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তদের যথাযথ দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা যে কত জরুরি, গাইবান্ধার উপনির্বাচন তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সবাইকে।
সাংবাদিক
abunoman1972@gmail.com




