নাফীজ আহমদ : বর্তমান সময়ে বিনোদনের নামে দেশে নানা ধরনের আয়োজন হচ্ছে। তারই একটি নতুন সংযোজন ‘সেলিব্রিটি ক্রিকেট লিগ’। বলা হচ্ছে, এটি একটি ‘বিনোদনমূলক খেলা’, যার উদ্দেশ্য শিল্পীদের মাঠে একত্র করা, খেলাধুলার প্রসার ঘটানো এবং দর্শকদের নতুন স্বাদে আনন্দ দেওয়া। কিন্তু বাস্তব চিত্র দেখলে বোঝা যায়, এই আয়োজন খেলার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি মূলত এক ধরনের ‘গ্ল্যামার শো’, যেখানে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও অপসংস্কৃতির চর্চাই মুখ্য।
এই লিগে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগই চলচ্চিত্র, নাটক বা সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখ। খেলাধুলার কোনো বাস্তব প্রশিক্ষণ, কৌশল কিংবা মানসিকতা তাদের মধ্যে নেই। মাঠে খেলার চেয়ে নাচ-গান, ডিজে পারফরম্যান্স, ক্যামেরাবান্ধব আচরণ এবং ফ্যাশন প্রদর্শনই যেন মুখ্য। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, খোলামেলা পোশাক ও চেহারাভিত্তিক উপস্থাপনÑসব মিলিয়ে এটি একটি অশ্লীল ‘উৎসব’-এ রূপ নিয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই আয়োজন ঘিরে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। অনলাইন পোর্টাল থেকে শুরু করে টেলিভিশন পর্যন্ত সবখানেই এদের নানা মুহূর্ত তুলে ধরা হয় ‘ট্রেন্ড’ বানিয়ে। অথচ এসব দৃশ্য তরুণদের মনোজগতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। যে বয়সে নৈতিক শিক্ষা ও আদর্শ গঠনের সময়, সেই বয়সেই তারা অশ্লীলতা ও বেহায়াপনাকে ‘বিনোদন’ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে।
ইসলামের দৃষ্টিতে এমন আয়োজনের অবস্থান: ইসলামে খেলাধুলা নিষিদ্ধ নয়, বরং তিরন্দাজি, ঘোড়দৌড়, কুস্তি, দৌড় প্রতিযোগিতাÑএসব খেলাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু শর্ত হলো, খেলাটি হতে হবে শরীরচর্চামূলক, সময়ের সদ্ব্যবহারকারী এবং চরিত্র ও নৈতিকতার রক্ষাকবচ। এর সঙ্গে যদি হারাম বিষয় যুক্ত হয়, যেমন অশ্লীল পোশাক, গানবাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, দৃষ্টি ও সম্মানের হেফাজতে ব্যাঘাত, তাহলে তা পরিপূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সুরা আন-নূর: ৩১)
মহানবী (স) এরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো মন্দ কাজ করতে দেখে, তবে সে যেন তা নিজ হাতে পরিবর্তন করে। যদি না পারে, তবে মুখে; যদি তাও না পারে, তবে অন্তরে ঘৃণা করুকÑএটাই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।’ (সহীহ মুসলিম)।
অথচ সেলিব্রিটি ক্রিকেট লিগসহ কতিপয় এসব আয়োজন সেই নির্দেশনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। নারীদের এখানে কেবল চোখের আরাম ও বিনোদনের উপকরণ বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়। তাদের পোশাক, অঙ্গভঙ্গি ও শারীরিক গঠনকে ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়, যা নারীর মর্যাদার পরিপন্থি।
এই বিপর্যয়ের দায় কার: এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কেবল আয়োজকদের দোষ দিয়ে সমাজ রক্ষা পাবে না। যারা এই আয়োজনের অনুমোদন দেয়, স্পন্সর করে, মিডিয়ায় প্রচার করে, আর যারা হাততালি দিয়ে উল্লাস করে, তাদের প্রত্যেকেই এই অপসংস্কৃতির দায়ে অংশীদার। একশ্রেণির মানুষ বলেন, ‘এটা তো বিনোদন, এত কঠোরভাবে দেখার কী আছে?’ অথচ তারা ভুলে যান, একটি জাতির চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন ঘটে মূলত তার সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই। আজ যেটাকে ‘অসামাজিক’ বলা হয়, বারবার দেখা ও উপস্থাপনার ফলে তা একদিন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজের করণীয় কী: ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হলো এ ধরনের অশ্লীল ও ভ্রান্ত বিনোদনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। প্রথমে পরিবারে, পরে সমাজে এবং তারপর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। আলেম-ওলামা, শিক্ষক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, লেখক ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে হালাল ও স্বাস্থ্যকর বিনোদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। খেলাধুলা হোক, কিন্তু সেটা যেন চরিত্রবান ও আদর্শনিষ্ঠ হয়। অনুষ্ঠান হোক, কিন্তু সেটি যেন ইসলামি শালীনতার সীমার মধ্যে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা সক্রিয়, তাদের উচিত এ বিষয়ে সঠিক বার্তা প্রচার করা, অশ্লীল কনটেন্ট বর্জন করা এবং সচেতন আলোচনা তৈরি করা।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও অনস্বীকার্য: যদি সরকার সত্যিকার অর্থে যুবসমাজকে রক্ষা করতে চায়, তবে এ ধরনের আয়োজনকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অনুমোদনের আগে নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ, অশ্লীল কনটেন্ট প্রচারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাধুলা ও বিনোদন-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
‘সেলিব্রেটি ক্রিকেট লিগ’ আমাদের দেশের তরুণ সমাজের জন্য একটি সাংস্কৃতিক ফাঁদ। খেলাধুলার আড়ালে যেভাবে অশ্লীলতা, অপসংস্কৃতি ও ধর্মহীনতা ছড়ানো হচ্ছে, তা ইসলামি সমাজব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি। এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজš§কে এক অন্ধকার ও নৈতিকতাহীন সমাজে ঠেলে দিতে হবে।
সুতরাং এখনই সময় বিষষটি নিবিড় পর্যালোচনার। ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সব স্তরে সুস্থ সংস্কৃতি ও ইসলামি মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। তা হলেই একদিন আমরা গড়ে তুলতে পারব একটি শালীন, সুস্থ ও আলোকিত সমাজ।
লেখক: শিক্ষার্থী, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।




