সেশনজট শিক্ষার্থীর মানসিক অসুস্থতা বাড়ায়

Mental disorder, finding answers, confusion concept. Woman suffering from depression, closing face with palms in despair, girl trying to solve complex problems. Simple flat vector

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে সেশনজট অতি সাধারণ একটি ব্যাপার। কিন্তু সেই শিক্ষকদের অতিসাধারণ ব্যাপারটিই আমাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসা শিক্ষার্থীদের জীবনের অভিশাপ। বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই সেশনজট নামক অভিশাপে পতিত হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উচ্চশিক্ষায় সম্মানের সময় নির্ধারণ করা হয় চার বছর এবং স্নাতকোত্তর সম্মানের সময় নির্ধারণ করা হয় এক বছর। এই মোট পাঁচ বছরের একটি প্রসপেক্টাস তৈরি করা হয় আমাদের উচ্চশিক্ষা দান করার জন্য। কিন্তু উচ্চশিক্ষার জন্য পাঁচ বছর সময় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের মাঝেই সীমাবদ্ধ।

আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রায়ই দেখতে পাই শিক্ষার্থীদের সম্মান ও স্নাতকোত্তর শেষ করতে প্রায় সাত থেকে আট বছর লেগে যায়। এই যে পাঁচ বছরের জায়গায় অতিরিক্ত দুই বা তিন বছর, এটিই সেশনজট বা সেশনজ্যাম নামে পরিচিত। এখন আসা যাক সেশনজট শিক্ষার্থীদের জীবনে কীভাবে অভিশাপ? আমরা উন্নত দেশগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাই, মাত্র ২০ থেকে ২২ বছর বয়সেই তাদের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ফেলেছে। সেসব শিক্ষার্থী তাদের তরুণ মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে গবেষণা করছে, দেশের উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন চিন্তা করছে, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে, তারা দেশের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

বলা যায়, তারা নিজেরা নিজের উন্নতির মাধ্যমে দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখছে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষার্থীরা দেশের উন্নয়নের জন্য কিছু করার অনুপ্রেরণা নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে এসে পড়ে যায় সমুদ্রের অতল গহ্বরে। যেখানে তারা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে আসে, সেখানে আসার পরেই তারা সেখান থেকে কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে ফেরার প্রার্থনা করে। উচ্চশিক্ষার জন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে হতাশার জগতে, যার একমাত্র কারণ সেশনজট। সেশনজটের কারণে বছরের পর বছর তাদের সময় নষ্ট হয়ে যায় বিনা কারণে, কিংবা বিনা কোনো দক্ষতা অর্জনে। এই সেশনজটের কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনার মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। শেখার ও জানার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায় সেশনজটের কারণে। তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এখানে প্রবেশ করে, সেই লক্ষ্য তখন হয়ে যায় পথভ্রষ্ট। সেশন জট বিনা কারণেই একজন শিক্ষার্থীর মানসিক অসুস্থতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজন সুস্থ-স্বাভাবিক শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে অ্যাখ্যা দিতে সেশনজটই যথেষ্ট।

একদিকে এই সেশনজট শিক্ষার্থীকে অসুস্থতার দিকে ধাবিত করছে, অন্যদিকে তার কর্মক্ষেত্রকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। কোনো শিক্ষার্থী যখন মানসিকভাবে বিরক্ত থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার পরবর্তী কর্মজীবনে স্বাভাবিক হওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যে শিক্ষার্থী দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে, সেই শিক্ষার্থীই এই সেশনজটের কবলে পড়ে শুধু এখান থেকে বেঁচে ফেরার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সেশনজটের ফলে সৃষ্ট এতসব সমস্যা যেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে কোনো সমস্যাই নয়। তারা অতি সাধারণ সমস্যার মতোই ধরে নেয় এই জীবনবিধ্বংসী সমস্যাকে। ফলে যেখানে তাদের উচিত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেশনজট নিরসন করা, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেশনজট নিরসনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বরাবরই ব্যর্থ হয়।
এই ব্যর্থতার দায় বহন করে বেড়াতে হয় স্বপ্নবাজ সব শিক্ষার্থীদের, যারা স্বপ্ন নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে এসেছিল। এই সেশনজটের ফলে সেসব শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও শক্তি একেবারেই ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে তাদের দ্বারা দেশের উন্নয়নের দ্বার উন্মোাচন হওয়ার যে সম্ভাবনা থাকে, সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। আমরা একটি জাতির উন্নয়নের জন্য শিক্ষাদান করে থাকি, উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করে থাকি, কিন্তু সেই শিক্ষা যদি হয় জীবনবিধ্বংসী, তাহলে জাতির উন্নতি সম্ভব কী করে? শিক্ষা গ্রহণের প্রতি বিমুখতা সৃষ্টির জন্য সেশনজট মুখ্য সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

আমাদের দেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নয়নের যে অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল তা সেশনজটের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসের পথে চলেছে। সেশনজট শুধু কোনো শিক্ষার্থীর জীবনকেই ধ্বংস করছে না, ধ্বংস করছে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও মেধা। ভেঙে দিচ্ছে দেশের মেরুদণ্ডকে, যা শুধু আমাদের তরুণ সমাজ বা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্যই অভিশাপ নয়, অভিশাপ আমাদের গোটা জাতির জন্য, গোটা দেশবাসীর জন্য। দেশকে বাঁচাতে ও শিক্ষার্থীদের জাগ্রত রাখতে সেশনজট নিরসনের বিকল্প পথ আর কিছুই নেই। দ্রুতই সেশনজট নিরসনের জন্য কঠোর পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেয়া উচিত এবং তা দেশের মেধা, সম্পদ ও শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথ মসৃণ করবে।

লেখক: সামিয়া জামান, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়