সা ক্ষা ৎ কা র

স্বল্প অর্থে অধিক ঋণ জোগানো সম্ভব : মো. মশিয়ার রহমান

শেয়ার বিজ: সম্প্রতি ‘ক্রেডিট এনহ্যান্সমেন্ট স্কিম’ চালু করেছে পিকেএসএফ। এই স্কিম কী এবং কাদের জন্য সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

মো. মশিয়ার রহমান: বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমইএস) খাতের অন্তর্গত প্রায় এক কোটি উদ্যোক্তা রয়েছে। যাদের নিয়ে ২০২০ সালে প্রকাশিত ইএসসিএপির একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই খাতে প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদার বিপরীতে তহবিল ঘাটতি রয়েছে ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ধারণা করা হয়, বর্তমানে এই ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬.১০ লাখ কোটি টাকা)। পিকেএসএফ মূলত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে চাহিদার বিপরীতে তহবিল ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৪ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা)। বর্তমানে পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থার মোট ২ কোটি ঋণগ্রহীতার মধ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ এবং গৃহীত ঋণের গড় প্রায় দুই লাখ টাকা। দেখা যাচ্ছে, শুধু এই ৫০ লাখ উদ্যোক্তার মোট ঋণ চাহিদা প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। পিকেএসএফ যদি তার মোট সদস্যের ৩ শতাংশ হিসাবে ৬ লাখ সদস্যকে ২৫ লাখ টাকা করে ঋণের আওতায় আনতে চায়, তবে পিকেএসএফের প্রায় ১.৫ লাখ কোটি টাকা তহবিল প্রয়োজন হবে। এ অবস্থায় পিকেএসএফ এবং এর সহযোগী সংস্থার নিজস্ব উৎস হতে অর্থায়ন দ্বারা এ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল লেভারেজ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গ্যারান্টি প্রদানের মাধ্যমে স্বল্প অর্থ ব্যবহার করে অধিক অর্থ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে পৌঁছে দেয়ার জন্য ক্রেডিট এনহ্যান্সমেন্ট স্কিম চালু করা হয়েছে। এই স্কিমের মাধ্যমে মূলত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততায় অধিক অর্থ সরবরাহ করে ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণ চাহিদা মেটাতে পিকেএসএফ কাজ করবে।

শেয়ার বিজ: এ স্কিমের প্রধান প্রধান সুবিধাগুলো কী?

মশিয়ার রহমান: ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে এই স্কিম একটি ব্যবহারিক সমাধান হিসেবে কাজ করবে। এ কারণে এডিবির আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পিকেএসএফ এই স্কিম চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মূলত পিকেএসএফ সরাসরি অর্থায়ন না করে ফাইন্যান্সিয়াল লিভারেজ বৃদ্ধির মাধ্যমে অধিক অর্থ প্রবাহ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ ধরনের স্কিমের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। যাতে গ্যারান্টি প্রদানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোগ ঋণ কার্যক্রম বাবদ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মূল অর্থের প্রায় ৭ গুণ অর্থ পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থাগুলোয় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তাছাড়া ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় বড় সংস্থাগুলোর ব্যালান্সসিট বিশ্লেষণ করে অর্থায়ন করে থাকে। যেহেতু ছোট ছোট সংস্থার বিষয়ে ব্যাংকের নিকট পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানে (এমএফআই) অর্থায়ন করতে আগ্রহী হয় না। এই স্কিমের মাধ্যমে পিকেএসএফ যেহেতু ঝুঁকি বহন করবে, সেহেতু ব্যাংকগুলো ছোট-বড় সব ধরনের এমএফআইকে অর্থায়নে আগ্রহী হবে।
যেসব ব্যাংক পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থাগুলোয় অর্থায়ন করে, তারা অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আর্থিক বিশ্লেষণ না করে অর্থায়ন করে যা প্রকারন্তে পিকেএসএফের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। এই স্কিমের মাধ্যমে এমএফআইগুলোয় যথাযথ ব্যাংক অর্থায়নের মাধ্যমে পিকেএসএফের ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাছাড়া এর মাধ্যমে এ খাতে ব্যাংক অর্থায়নে শৃঙ্খলা আনয়ন করা সম্ভব হবে।
তাছাড়া যেহেতু তহবিল প্রবাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি পিকেএসএফ তদারকি করবে, সেহেতু ব্যাংকের তদারকি খরচও কমে আসবে। তাছাড়া ঋণ গ্যারান্টেড হওয়ায় গ্যারান্টিকৃত অংশের জন্য ব্যাংকগুলোর কিছু ক্ষেত্রে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হবে না। এসব বিষয় বিবেচনায় এই স্কিমের আওতায় ঋণ বিতরণ করা ব্যাংকের জন্যও লাভজনক হবে।
ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থাগুলোকে অনেকটা বাধ্যতামূলক এফডিআর রাখতে হয়, যা ক্ষেত্রবিশেষে মোট গৃহীত ঋণের ২০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর ফলে সহযোগী সংস্থা কার্যত গৃহীত ঋণের ৮০ শতাংশ ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। এই স্কিমের আওতায় গৃহীত ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সহযোগী সংস্থাগুলোর বাধ্যতামূলক এফডিআর রাখার ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকবে।

শেয়ার বিজ: এই স্কিমের সঙ্গে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সংশ্লিষ্টতা কী? এ উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে কী ধরনের সহায়তা পাবে পিকেএসএফ?

মো. মশিয়ার রহমান: এডিবির সহায়তায় পিকেএসএফ বর্তমানে এমএফসিই নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ক্ষুদ্র উদ্যোগে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সাল থেকে পিকেএসএফ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। মাঠ পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৃহৎ পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্তরায়গুলোর মধ্যে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো তহবিল স্বল্পতা। পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থাগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোগ অর্থায়নের অন্যতম বড় জোগানদাতা। পিকেএসএফের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগী সংস্থাগুলোকে ক্ষুদ্র উদ্যোগ ঋণ কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন করলেও তা মাঠ পর্যায়ের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের তহবিল ঘাটতি কমিয়ে তাদের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক ব্যাংক নির্ভরতা বাড়ানোর জন্য এডিবির সহায়তায় এমএফসিই প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে ক্রেডিট এনহ্যান্সমেন্ট স্কিম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই স্কিমের আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সহযোগী সংস্থাগুলোকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে পিকেএসএফ গ্যারান্টি প্রদানের মাধ্যমে ঝুঁকির একটি অংশ সরাসরি বহন করবে। স্কিম চালু করার জন্য এডিবি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে।

শেয়ার বিজ: পিকেএসএফ এ ধরনের আর কী কী স্কিম চালু করেছে? এ সংস্থাটির সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে সংক্ষেপে জানতে চাই।

মো. মশিয়ার রহমান: কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার পিকেএসএফ প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এর বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা অর্থাৎ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে আসছে পিকেএসএফ। কালের পরিক্রমায় পিকেএসএফ উপলব্ধি করেছে যে, কেবল আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে টেকসইভাবে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়, এর পাশাপাশি বিভিন্ন অ-আর্থিক ও কারিগরি পরিষেবারও প্রয়োজন রয়েছে। তাই পিকেএসএফের সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে ক্ষুদ্র অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, কারিগরি, ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান করে থাকে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ উন্নয়নে পিকেএসএফ কাজ শুরু করেছে ২০০১ সাল থেকে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিয়ে পিকেএসএফের মূল কার্যক্রমের নাম ‘অগ্রসর’। এই কার্যক্রমের আওতায় দেশব্যাপী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হয়। ‘অগ্রসর’ কার্যক্রম শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল, এডিবি প্রভৃতি উন্নয়ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ও বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে পিকেএসএফ। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক পরিষেবা দেয়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, ভ্যালু চেইন সুসংহতকরণ, তরুণ উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি জলবায়–-সহিষ্ণু রিসোর্স ইফিসিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন চর্চা রপ্ত করার মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে সবুজ প্রবৃদ্ধি সঞ্চার করারও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এতে দূষণ কমবে এবং বিভিন্ন সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাত পরিচ্ছন্ন উৎপাদনের দিকে ধাবিত হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশব্যাপী লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যেমন পরিবেশ বিপদাপন্নতা বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করছেন, তেমনি পরিবেশের ক্ষতি না করেও ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের সহায়তায় উদ্যোক্তারা তাদের পণ্যের ব্র্যান্ডিং করার মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের বিস্তৃত বাজারে প্রবেশের দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাত যত বিকশিত হবে তত নতুন উদ্যোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। বর্জ্য রিসাইকেল করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা এবং বর্জ্য শোধন করার মতো সহজলভ্য প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে আমরা ‘জিরো ওয়েস্ট’ ধারণার বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছি। এ জন্য আমরা প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরিষেবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছি।

শেয়ার বিজ: আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মো. মশিয়ার রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।