চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন

হাজার কোটি বিনিয়োগের ফলাফল শূন্য

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম শহর দেশের বাণিজ্যিক নগরী। এ শহরে জলাবদ্ধতা পুরোনো সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ করলেও গত দুই দশকের জলাবদ্ধতা কমেনি, বরং বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে ব্যাহত হচ্ছে জনসাধারণের জীবনযাত্রা। পাশাপাশি অর্থ ও বাণিজ্যের গতিও ব্যাহত হচ্ছে।

তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে ভারী বর্ষণে ডুবে গেছে চট্টগ্রাম নগরের অধিকাংশ এলাকা। রাস্তাঘাটে পানি জমে থাকায় অনেক সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টিতে নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ সিডিএ ও শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা, ছোটপোল, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, শুলকবহর, মোহাম্মদপুর, কাপাসগোলা, চকবাজার, বাকলিয়ার বিভিন্ন এলাকা, ফিরিঙ্গিবাজারের একাংশ, কাতালগঞ্জ, কেবি আমান আলী রোড, চান্দগাঁওয়ের শমসের পাড়া, ফরিদার পাড়া, পাঠাইন্যাগোদা, মুন্সীপুকুর পাড়, তিন পুলের মাথা, রিয়াজউদ্দিন বাজার, মুরাদপুরের বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও অলিগলি পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এ সময়ে চকবাজার ও রিয়াজউদ্দিন বাজারে কাঁচাবাজারের দোকানপাট পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের দোকান-আড়তেও পানি ঢুকে ক্ষতি হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল ভোর ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড করেছে অধিদপ্তর। ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৯টা থেকে রোববার ৯টা পর্যন্ত) বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ২১৮ মিলিমিটার। এই মৌসুমে এটাই সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড।

সরেজমিনে দেখা যায়, দুই দফায় অন্তত শহরের ৫০টি এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় পানি জমে ছিল ৯-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত। এমনকি সিটি মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর বহদ্দারহাটের বাড়ির উঠান ও সামনের রাস্তাও ডুবে যায়। শুক্রবারের মতো গতকালও রিকশা চড়ে ঘরে ঢুকতে হয়েছে মেয়রকে। জলাবদ্ধ এলাকাগুলোয় অনেকে দোকানপাটও খুলতে পারেননি। জানা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিকের একটি, সিডিএ’র দুটি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের আওতায় ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার কাজ চলছে। আগামী বছরের জুনে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে বলে সংশিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে নগরের বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে বলিরহাট পর্যন্ত নতুন খাল খননে ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে চসিক। ২০১৪ সালের জুনে অনুমোদন হলেও এ প্রকল্পের কাজ এখনও শেষ করতে পারেনি সংস্থাটি। অপরদিকে  জলাবদ্ধতা দূর করতে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছিল সিডিএ। কাজ শুরু হয় পরের বছরে। এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এই টাকায় ৩৬টি খালের ময়লা-বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়েছে, নির্মাণ করা হয়েছে প্রতিরোধ দেয়াল, নতুন নালা, সেতু ও কালভার্ট। এছাড়া পাঁচটি জলকপাট চালু করা হয়েছে। আর কর্ণফুলী নদীর পাশে বাঁধসহ রাস্তা নির্মাণে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড নগরের কর্ণফুলী ও হালদা নদীর সঙ্গে যুক্ত নগরের ২৩ খালের মুখে জলকপাটের কাজ এখনও শেষ করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯৭ কোটি টাকা। প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যায়। বর্ষার সঙ্গে জোয়ারের পানি মিশে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। এখন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আবার বেশি সময় ধরে পানি জমে থাকছে। 

ব্যবসায়ীরা বলেন, জলাবদ্ধতার জন্য সরকারের এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে জনগণকে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, বৃষ্টির পানি খাল ও নালা দিয়ে শহরের পানি নদীতে নেমে যেত। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল ও দূষণের কারণে সেই খালের বেশির ভাগই ভরাট হয়ে গেছে। অন্যদিকে জোয়ারের সময় সাগরের পানি এসে শহরে ঢুকে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেছে। এছাড়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন সংস্থা চারটি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। কিন্তু এই তিন সংস্থার কাজেও সমন্বয়হীনতা আছে। বিশেষ করে চসিক ও সিডিএ পরস্পরকে সহায়তা না করায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্ভোগ বাড়ছে।

চউকের প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা দেড় গুণ ক্ষতি পূরণে খালের কাজ শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে সরকার তিন গুণ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে দেন। আমরা ক্ষতিপূরণের টাকা বরাদ্দ না পাওয়ায় নতুন আরও ২০টি খালের কাজ শুরু করতে পারছি না। আমরা দেড় বছর আগে সংশোধিত প্রকল্প জমা দিয়েছি; যা এখনও পাস হয়নি। আর কর্ণফুলী নদীর পাশে বাঁধসহ রাস্তা নির্মাণে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। এটির কাজ বেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে আগামী দেড় বা দুই বছরের মধ্যে জলাবদ্ধতার সুফল পাওয়ার আশা করছি। তিনি আরও বলেন, একটা চাক্তাই খাল দিয়ে এত বেশি পানি প্রবাহিত হতে পারে না। তাই মহাপরিকল্পনায় নগরের বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে বলিরহাট পর্যন্ত নতুন খাল খননে সুপারিশ করা হয়েছিল। যা সরকার ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু  গত ১৭ বছরে চসিক তা বাস্তবায়ান করতে পারেনি। এছাড়া সিটি করপোরেশন ঠিকমতো নালা-নর্দমাগুলো পরিষ্কার করছে না। এসব কারণে নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম শেয়ার বিজেকে বলেন, আমরা জলাবদ্ধতা নিরসন কাজের ১৩ শতাংশ অংশীদার, পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৫ শতাংশ এবং সিডিএ ৭২ শতাংশ। প্রকল্প সিডিএ খালগুলো থেকে দৃশ্যত বাঁধ অপসারণ করলেও মাটি রয়ে গেছে। তাতে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা জলকপাটগুলোর কাজও শেষ করতে পারেনি। আর আমাদের কাজের ৫০ শতাংশ অগ্রগতি আছে। আশা করছি আগামী এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। যদিও এ নতুন খালের সঙ্গে জলাবদ্ধতার কোনো সম্পর্ক আপাতত নেই। তবে এ খাল খনন শেষ হলে তখন নগরবাসী সুফল পাবে।