হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের প্রয়োজনীয়তা

কাব্য সাহা: বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস পালিত হয়। বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যÑফার্মাসিস্টরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছেন। প্রতিবছর এই দিনে ফার্মাসিস্টরা দেশে-বিদেশে যে মানসম্মত ওষুধ তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকে পালন করে যাচ্ছেন, এই মহান পেশার মানুষদের উৎসাহ প্রদানে এবং এই পেশা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ২০১০ সাল থেকে সারাবিশ্বে ওয়ার্ল্ড ফার্মাসিস্ট দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

ফার্মাসিস্ট নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মধ্যে এখনও ভিন্ন মতের চর্চা রয়েছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের ধারণা ফার্মাসিস্ট মানেই ওষুধ বিক্রেতা। ওষুধশিল্পে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা কতখানি এর সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে কী? মূলত একজন ওষুধ বিক্রেতা হলেন ফার্মেসি টেকনিশিয়ান, যেখানে তিন মাসের কোর্স করে ফার্মেসি টেকনিশিয়ান হিসেবে সার্টিফিকেট পান। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে এখানেও এর ভিন্নতা রয়েছে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন পেশায় কাজ করা মানুষ ওষুধের দোকানে কাজ শেখেন, অর্থাৎ ওষুধ বিক্রির কাজ শিখে হয়ে যাচ্ছেন ফার্মেসি টেকনিশিয়ান। আবার কোনো কোনো ওষুধের দোকানে ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি চলে প্রাথমিক চিকিৎসার কাজ। আবার বিক্রেতাদের কেউ কেউ নিজেই রোগের কথা শুনে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বিবেচনা ছাড়াই দিচ্ছেন নানা রোগের ওষুধ, রোগীরাও সাদরে সেই সেবা গ্রহণ করে চলেছেন। তারা তিন-চার মাসের ওষুধ বিক্রির প্র্যাকটিক্যাল ধারণা থেকেই সাধারণ মানুষের কাছে বনে যাচ্ছেন ফার্মাসিস্ট! মূলত ফার্মাসিস্টদের পরিচিতি নিয়ে এমন বিভ্রান্তির কারণ সচেতনতার অভাব।

একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, কথায় আছে ‘একজন ডাক্তার ভুল করলে একজন রোগী মারা যাবেন, কিন্তু একজন ফার্মাসিস্ট ভুল করলে জাতি বড় একটি সংখ্যা হারাবে।’ একজন ফার্মাসিস্ট ওষুধ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ওষুধের গুণগত মান নির্ধারণ, ওষুধ নির্ধারণ, ডোজ নির্ধারণ কিংবা ওষুধের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকেন। একজন ফার্মাসিস্টের হাতেই পরোক্ষভাবে তৈরি হয় হাজারো মানুষের সুস্থতা এবং সুন্দর জীবনের গল্প। তবে একজন ফার্মাসিস্টের দৈনন্দিন জীবনের গল্প আমরা কজন জানি?

একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট দেশের জন্য কাজ করতে বদ্ধপরিকর। সূর্য আকাশে ওঠার আগেই যেই মানুষটি নিজেকে ফার্মাসিউটিক্যালসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন, তিনিই একজন ফার্মাসিস্ট। ঋতুবদলের ভিন্নতায় শীতের সকালে কুয়াশার চাদর ঠেলে নির্দিষ্ট সময়ে ফার্মাসিউটিক্যালসে পৌঁছে যাওয়া মানুষটি একজন ফার্মাসিস্ট। নিজেকে প্রটেক্ট করা থেকে শুরু হয়ে নির্ধারিত সময় থেকেই শুরু হয়ে যায় তার জীবনযুদ্ধ। দীর্ঘ সময় কাজ শেষ করে, ওভার টাইমের জন্য কখনও কখনও সুযোগ হয় না সূর্য দেখার, তবুও লক্ষ্য একটাইÑদেশের মানুষের জন্য নিজের সবটুকু শ্রম দিয়ে অসুস্থ মানুষের নানা হাসির গল্প তৈরি করা। প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে একজন ফার্মাসিস্টের এমন জীবনের অসংখ্য বাস্তবতা। ওষুধে জীবন দেয়া ফার্মাসিস্টরা শুধু ওষুধ তৈরি করেই বসে নেই, তারা দুর্গম থেকেও দুর্গম প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন ওষুধের সেবা। তবুও তাদের সম্মান পরিপূর্ণতা পায় না, হয় না একজন ফার্মাসিস্ট যথাযথ মূল্যায়ন।

একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রধান দায়িত্ব ওষুধ প্রস্তুত করা। তবে একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের ব্যাপ্তি নিশ্চয়ই এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। ফার্মেসির বাকি সেক্টরগুলোয় ফার্মাসিস্টদের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কিছু বিষয় আলোকপাত করা যাক। ফার্মাসিস্টদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল দায়িত্বের পাশাপাশি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হসপিটাল বা ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি পরিচালনা করা। রোগী অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসার জন্য আসবে, চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রোগ বিবেচনা করে ফার্মাসিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ দেবেন। অন্যথায় কোন ডোজের ওষুধ রোগীর জন্য প্রযোজ্য, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে, তা নিরূপণ করা কঠিন। স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, নার্স ও টেকনোলজিস্টের সমন্বয়ে রোগীর চিকিৎসা হওয়াটা সঠিক পদ্ধতি। কিন্তু আমাদের দেশে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট দ্বারা চিকিৎসাসেবা চললেও নেই ফার্মাসিস্টদের সঙ্গে সমন্বয়। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা একপ্রকার অবহেলিত এক্ষেত্রে। ওষুধের ডোজ কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে বিস্তর ধারণার অভাবে একজন রোগীর নানা রকম শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমান চিকিৎসাসেবায় চিকিৎসকের পর নার্স দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্যই একজন নার্সের পক্ষে ওষুধের বিশদ নিরূপণ কখনও সম্ভব নয়, কিংবা হওয়ার কথাও নয়। সুতরাং ওষুধের মান বিবেচনার ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টের বিকল্প ভাবাই যায় না। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে দেশের হসপিটালগুলোয় ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।

ওষুধশিল্পে রপ্তানি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা সেই পর্দার আড়ালের মানুষগুলো সব ক্ষেত্রে যথাযথ মূল্যায়ন পাবেনÑবিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে এমনটিই প্রত্যাশা।

শিক্ষার্থী

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ও নিবন্ধিত এ-গ্রেড ফার্মাসিস্ট