মাজহারুল ইসলাম সৈকত: দ্রব্যমূল্যের টানা ঊর্ধ্বগতিই বলে দেয় কতটা সংকটে দেশের অর্থনীতি। হুন্ডি নামের অবৈধ ব্যবসা অন্যতম দায়ী এমন সংকটের জন্য। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয়ের থেকে আমদানি ব্যয় বেশি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। যার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। এ ঘাটতি মেটাতে গিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপ, যার কারণে দেশের অর্থনীতির এই অবস্থা। এই বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের উপায় হতে পারত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠায় ২১.০৩ বিলিয়ন ডলার, যা তার আগের বছরের তুলনায় ৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার কম।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই রেমিট্যান্স প্রবাহ নি¤œমুখী হলো? তার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠানো।
হুন্ডি কী? হুন্ডি হলো সাধারণ অবৈধ পথে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ আদান-প্রদানের মাধ্যম বা পদ্ধতি, মোগল আমলে হুন্ডি পরিচিতি লাভ করলেও প্রচার লাভ করে ব্রিটিশ শাসন আমলে প্রবাসীরা ঠিকই দেশে অর্থ পাঠাচ্ছে কিন্তু হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হলে দেশের মোট জাতীয় আয়ে এই অর্থ যোগ হয় না অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যোগ হয় না। এতে করে দেশের সম্পদ ও অর্থ বৃদ্ধি পায় না। যদিও ব্যক্তি ক্ষেত্রে টাকার চাহিদা মিটে। হুন্ডির মাধ্যমে শুধু দেশে অর্থ আসে ব্যাপারটা এমন নয় হুন্ডি হচ্ছে অর্থ আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম; যার মাধ্যমে দেশে অর্থ যেমন আসে, তেমনি অর্থ পাচারও হয়। দেশের সবচেয়ে বেশি টাকা পাচার হয় এই হুন্ডির মাধ্যমে। ব্যাংকিং মাধ্যমে বৈদেশিক আদান-প্রদান করলে তা হয় বৈধ পদ্ধতি। আর ব্যাংক ছাড়া হুন্ডি, নগদ অর্থ দেশের বাইরে সঙ্গে করে নেয়া, অর্থ পাচার ইত্যাদি সব অবৈধ। বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক নেতা, এমপি-মন্ত্রী, আমলা, সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে এই হুন্ডির সঙ্গে জড়িত। এখন প্রশ্ন কেন মানুষ বৈধ পথ ছেড়ে অবৈধ পথ বেছে নেয় অর্থ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে? কেন ব্যাংকে না গিয়ে অবৈধ পথে ছুটে? তার বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
প্রথমত, যারা দেশে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করে অর্থাৎ ঘুষ খায়, চাঁদাবাজি করে লুটপাট করে তারা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করে। কারণ যারা অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করে তারা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক লেনদেন করলে ধরা খেয়ে যাবে এই জন্য অবৈধ হুন্ডিকেই বেছে নেয় বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যম হিসেবে। দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবাজি বন্ধ করা না গেলে অর্থ পাচার চলতেই থাকবে। আর যদি নিজের পকেট ভারী করার মন অমানুষিকতা নিয়ে সবাই বসে থাকে সমস্যা সমাধান কখনোই হবে না।
দ্বিতীয়ত, দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতা, দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলোর আন্তঃসম্পর্ক দুর্বল। বর্তমান ব্যাংকসমূহে ডলারের মূল্য ৯৫ হলেও খোলাবাজারে বিক্রি হয় ১১০-১১৫ টাকা; যার কারণে বিদেশ থেকে প্রবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠালে যেখানে ৯৫ হাজার টাকা পাবে, সেখানে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে পাঠালে পাওয়া যায় ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার পর্যন্ত; যা ব্যাংকিং বিনিময়ের থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যবধান। প্রবাসীরা যেখানে প্রতি লাখে প্রায় ২০ হাজার টাকা বেশি পায়, সেখানে পাঠানোই স্বাভাবিক। এই ক্ষেত্রে ডলারের খোলাবাজারের দর নিয়ন্ত্রণের রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ নজরদারি আর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, ইতোমধ্যে সরকার বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য আড়াই শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, কিন্তু এই প্রণোদনা অপ্রতুল মনে হচ্ছে। কারণ মানুষ হুন্ডির মাধ্যমে তার থেকে বেশি লাভে টাকা পাঠাতে পারছে। প্রণোদনা বাড়িয়ে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানো বন্ধ হবে না, তবুও কমানো যাবে হয়তো।
চতুর্থত, সরজমিনে তাকালে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে অনেক। যেমন ব্যাংকে বৈধ পথে টাকা পাঠাতে গেলেও অনেক ধরনের কৈফিয়ত দিতে হয়, প্রথমে দিনে অনেকগুলো ফরম, তারপর কেন পাঠাবে, কার টাকা, এই কাগজপত্র, আয়ের সনদপত্র, সত্যায়ন, আজ নয় কাল আসেন আজ হবে না ইত্যাদি। যার কারণে মানুষ ব্যাংকে না গিয়ে অবৈধ হুন্ডি বেছে নেয়। ব্যাংকগুলোর উচিত এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সহজেই কোনো পেরেশানি ছাড়া বৈদেশিক লেনদেন করা যাবে।
পঞ্চমত, হুন্ডিতে সহজলভ্যতা আন্তরিকতা, লাভ বেশি। যেখানে ব্যাংকে গেলে এত এত কৈফিয়ত দিতে হয়, সেখানে হুন্ডি ব্যবসায়ীকে একটি কল করলেই বাড়িতে এসে টাকা নিয়ে যায় এবং পাঠানো টাকা মুহূর্তেই দিয়ে যায় একই সঙ্গে লাভ তো আছেই এত সুবিধা পেলে হুন্ডি করাই স্বাভাবিক। ব্যাংকগুলোর উচিত একই ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করার সঙ্গে চমক প্রণোদিত প্যাকেজ ঘোষণা করা, যাতে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়।
ষষ্ঠত, বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া গ্রাম পর্যায়ে তেমন কোনো ব্যাংকের শাখা নেই; যার কারণে মানুষ ব্যাংকের শাখা না পেয়ে সহজলভ্য হুন্ডিকে বেছে নেয়। ব্যাংকগুলোর দেশের সর্বত্র শাখা দেয়ার সামর্থ্য না থাকলে ব্যাংক খুলে বসার কি দরকার? কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেয়ার আগে এই বিষয়গুলো দেখা উচিত।
সপ্তমত, ইদানীং একটি অভিযোগ খুবই বেশি শোনা যাচ্ছে তা হলো, প্রবাসীদের সঙ্গে বিমানবন্দরে যথাযথ সম্মান দিয়ে আচরণ করা হয় না। অনেকে অভিযোগ করেছেন, তাদের মানুষ মনে করা হয় না। আবার কেউ বলেছেন তাদের পাঠানো জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলা হয়। এমন আচরণ আসলেই দুঃখজনক। প্রবাসীদের এই রাগ অবৈধ পথে টাকা পাঠানোর আরেকটি কারণ হতে পারে। ইদানীং প্রবাসীদের করা কয়েকটি সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে দেখতে পাই তারা তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্বের কথা বলছে; একই সঙ্গে বিমানবন্দরে তাদের অবহেলার কথা বলছে এবং পাসপোর্ট ভিসা পেতে যেই হয়রানি ঘুষ দিতে হয় তার কথাও টেনে এনেছে। এর থেকে বুঝা যায় প্রবাসীদের মনে যেই ক্ষোভ আছে তার প্রতিফলনের একটি মাধ্যম হুন্ডিতে টাকা পাঠানো। এসব বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অষ্টমত, দেশের অভ্যন্তরে মানি এক্সচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। তারাই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ডলারের খুচরা বাজার দর বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান, যা আছে তার থেকে ডাবল অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেগুলো কর্তৃপক্ষের ধরাছোঁয়ার বাইরে, যার ফলে ইচ্ছামতো বাজারে দাম বাড়িয়ে সংকট তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রশাসন, সরকারের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এসব নির্মুল করতে হবে।
সাধারণ মানুষের অসচেতনতাই হুন্ডি রোধে করার মূল কারণ। মানুষ যতটা না দেশের অর্থনীতির কথা ভাবে তার থেকে ভাবে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা। যদিও এটা স্বাভাবিক সবাই নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নতি করবে। তবে একই সঙ্গে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত সবার।
দেশে বৈদেশিক অর্থের বিনিময়ের আনুমানিক ৫০ শতাংশের বেশি হয় হুন্ডির মাধ্যমে, যা আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। যদিও হুন্ডির মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয় ও কী পরিমাণ দেশে প্রবেশ করে তার হিসাব কারও কাছেই নেই। আইন করে হুন্ডি একেবারে বন্ধ করা যাবে না; তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সরকারের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া।
এক্ষেত্রে একটা বিষয় সবার মাথায় রাখতে হবে, শুধু আইন আর নিয়ম করা কখনও সমাধান হতে পারে না। আইন করার পর যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে এবং জনগণের আইন মানার সদিচ্ছা থাকতে হবে। হুন্ডি বন্ধের ব্যাপারেও সরকার অবশ্যই সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে; একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন হয়ে হুন্ডিকে না বলে বৈধ পথে বৈদেশিক লেনদেন করতে আগ্রহী হতে হবে।
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ফেনী সরকারি কলেজ