পলাশ শরিফ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় চামড়াশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘এপেক্স ট্যানারি’র মুনাফা কমছে। আট বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় ৬৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমেছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়ার চাহিদা ও মূল্যহ্রাস এবং চামড়া প্রক্রিয়াজাতে খরচ বৃদ্ধির কারণে কোম্পানির মুনাফা কমেছে বলে দাবি কোম্পানি কর্তৃপক্ষের। এ-ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের কারণে কোম্পানির উৎপাদন ব্যাহত ও মূলধনি ব্যয় বেড়েছে।
নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরে এপেক্স ট্যানারির পণ্য বিক্রিলব্ধ আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। যা এর আগের (২০১৫-১৬) আর্থিক বছরের তুলনায় প্রায় ২০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা কম। রফতানি আয় কমায় এ সময় কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ৫০ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে চার কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমেছে। সে হিসেবে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত আট পঞ্জিকাবছরে এপেক্স ট্যানারির কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বা ৬৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমেছে।
এপেক্স ট্যানারির নির্বাহী পরিচালক এমএ মাজেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমেছে। সে সঙ্গে মূল্যও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাড়তি খরচ। চামড়া প্রক্রিয়াজাতে খরচ বেড়েছে। এতে ট্যানারিগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে। অন্যসব কোম্পানির মতো আমরাও সংকটে পড়েছি। সর্বশেষ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়েছে হাজারীবাগ থেকে চামড়াশিল্প স্থানান্তর। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূলধনি ব্যয়ও বেড়েছে। এসব কারণে ঘুরে দাঁড়ানোটা বেশ কঠিন হচ্ছে।’
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৮৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় চামড়া খাতের কোম্পানি এপেক্স ট্যানারি। শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গ্রæপের কোম্পানিটি পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রফতানি করে। তালিকাভুক্তির পর কয়েক দশক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল এপেক্স ট্যানারি। বেশকিছু কারণে ২০১০ সালের পর সংকটের মুখে পড়ে কোম্পানিটি। ২০১০-১১ আর্থিক বছরে প্রায় ২৫১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করে এপেক্স ট্যানারি। যা তার আগের (২০০৯-১০) আর্থিক বছরের তুলনায় প্রায় চার কোটি ৬০ লাখ টাকা কম। এক বছরে কোম্পানিটির রফতানি আয় প্রায় ৭৯ কোটি ২২ লাখ বাড়লেও কর-পরবর্তী মুনাফা প্রায় চার কোটি ৬০ লাখ টাকা কমে যায়। যার মূল কারণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। এর বিপরীতে রয়েছে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া। এরপর প্রায় আট বছর ধরে সংকটের আবর্তে ঘুরপাক করছে এপেক্স ট্যানারি।
নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সর্বশেষ আর্থিক বছরের শেষদিকে এপেক্স ট্যানারির কারখানা রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই বিক্রিলব্ধ আয় এর আগের আর্থিক বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে সাভারে কারখানা স্থানান্তর ও নতুন কারখানা নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে ব্যাংকঋণের পাশাপাশি এফডিআরও ভাঙতে হয়েছে। এতে এফডিআরের সুদ থেকে কোম্পানির আয় প্রায় এক কোটি ২১ লাখ টাকা কমে গেছে। একইভাবে ব্যাংকঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে আর্থিক ব্যয় প্রায় দুই কোটি ৪৭ লাখ টাকা বেড়েছে। এ ধাক্কা কোম্পানির আয়-মুনাফার প্রবৃদ্ধির ধারা ব্যাহত করেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে মতপ্রকাশ করা হয়।
উল্লেখ্য, ৭০ দশকের মাঝামাঝি পথচলা শুরু এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ চামড়া রফতানিকারক কোম্পানিতে রূপ নেয়। এরপর ১৯৮৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ৫০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে কোম্পানিটির বর্তমান পরিশোধিত মূলধন ১৫ কোটি টাকা। এপেক্স ট্যানারির মোট এক কোটি ৫২ লাখ শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীর হাতে ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। সর্বশেষ এপেক্স ট্যানারির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দুই টাকা ৯৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। আর শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য ৭৩ টাকা ৫৬ পয়সা। তবে সংকটে থাকলেও বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য হারে নগদ লভ্যাংশ দিচ্ছে এপেক্স ট্যানারি। যা সর্বশেষ ৪০ শতাংশ ছিল। যে কারণে স্বল্প মূলধনি কোম্পানিটির শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ছে। এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১২১ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১৬৭ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।