১১ এলপিজি কোম্পানির ভ্যাট বকেয়া ৫৬ কোটি টাকা

রহমত রহমান: এলপিজি সরবরাহ কোম্পানিগুলোর কাছে ভ্যাট বকেয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। ১১ কোম্পানির কাছে এনবিআরের এই ভ্যাট বকেয়া রয়েছে। এনবিআরের সুস্পষ্ট আদেশ থাকার পরও কোম্পানিগুলো ২০২১ সালে স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ২ শতাংশ হারে এই ভ্যাট পরিশোধে গড়িমসি করছে। চট্টগ্রাম ও খুলনা ভ্যাট কমিশনারেট এই ভ্যাট আদায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি এলপিজি কোম্পানিকে বকেয়া ভ্যাট পরিশোধ করতে চিঠি দেয়া হয়েছে।

এনবিআরের তথ্যমতে, খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন এলপিজি কোম্পানিগুলোর কাছে বকেয়া ভ্যাট আদায়ে ইতোমধ্যে চিঠি দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চারটি কোম্পানিকে দেয়া চিঠিতে অনুযায়ী বকেয়া ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। মূলত কোম্পানিগুলো ২০২১ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত উৎপাদন পর্যায়ে সরবরাহ মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করা হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ২ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করেনি। কোম্পানিগুলো হলো ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, বেক্সিমকো এলপিজি লিমিটেড, এসকেএস এলপিজি লিমিটেড ও পেট্রোম্যাক্স এলপিজি লিমিটেড। এর মধ্যে বেক্সিমকো এলপিজিকে চারটি চিঠি দেয়া হয়েছে; যাতে জড়িত বকেয়া ভ্যাট প্রায় তিন কোটি ৬৭ লাখ টাকা। একইভাবে ওমেরা পেট্রোলিয়ামকে তিনটি চিঠি দেয়া হয়েছে; যাতে বকেয়া ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি ৬২ লাখ টাকা। পেট্রোম্যাক্স এলপিজিকে দুটি চিঠি দেয়া হয়েছে, যাতে বকেয়া ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর এসকেএস এলপিজি লিমিটেডকে তিনটি চিঠি দেয়া হয়েছে; যাতে জড়িত বকেয়া ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ টাকা।

খুলনা ভ্যাট কমিশনারেটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২১ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত কোম্পানিগুলো স্থানীয় পর্যায়ে ২ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করেনি। ইতোমধ্যে চারটি কোম্পানিকে চিঠি দেয়া হয়েছে। একটি কোম্পানি কিছু ভ্যাট জমা দিয়েছে। বাকি ভ্যাটও জমা হবে। তবে এই চারটি কোম্পানির  কয়েক মাস এখনও হিসাব করা হয়নি। সেজন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি যাচাই শেষে যাতে বকেয়া পাওয়া যাবে, তাদের চিঠি দেয়া হবে।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন সাতটি এলপিজি কোম্পানি রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে এই ভ্যাট আদায়ে মামলা করা হয়েছে। এই সাতটি এলপিজি কোম্পানির কাছে ভ্যাট বকেয়া রয়েছে ৪৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩২ কোটি ১২ লাখ টাকা আদায়ে কমিশনারেট থেকে কোম্পানিগুলোকে চিঠি (সার্টিফিকেট) জারি করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো হলোÑইউরো পেট্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড (ইউরো এলপিজি), ইউনিভার্সেল গ্যাস অ্যান্ড গ্যাস সিলিন্ডার লিমিটেড (ইউনিভার্সেল এলপি গ্যাস), জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড (জেএমআই এলপিজি), ইউনিটেক্স এলপি গ্যাস লিমিটেড (ইউনিগ্যাস), পদ্মা এলপিজি লিমিটেড (পদ্মা এলপি গ্যাস), প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস লিমিটেড ও বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড। সাতটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ৪২টি মামলা করা হয়েছে, যাতে জড়িত ভ্যাট প্রায় ৫৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৭টি মামলা নিষ্পত্তিতে প্রায় ১১ কোটি ৮১ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।

আর ১১টি মামলা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে, যাতে জড়িত ভ্যাট প্রায় ১৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইউরো পেট্রো প্রোডাক্টস এর চারটি মামলায় প্রায় দেড় কোটি টাকা, ইউনিভার্সেল গ্যাস একটি মামলায় প্রায় ১ লাখ টাকা, জেএমআই একটি মামলায় প্রায় দুই কোটি টাকা, ইউনিটেক্স একটি মামলায় প্রায় চার কোটি ৭২ লাখ টাকা, পদ্মার দুইটি মামলায় প্রায় ৩৪ লাখ টাকা ও বিএম এনার্জির দুটি মামলায় প্রায় আট কোটি ৫৫ লাখ টাকা ভ্যাট জড়িত। আবার উচ্চ আদালতে সাতটি মামলা বিচারাধীন, যাতে জড়িত ভ্যাট প্রায় ১৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইউরো পেট্রোর একটি মামলায় প্রায় ৬৫ লাখ টাকা, জেএমআই-এর একটি মামলায় প্রায় তিন কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ইউনিটেক্সের দুটি মামলায় প্রায় তিন কোটি ৭২ লাখ টাকা, পদ্মার একটি মামলায় প্রায় এক কোটি ২২ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার এলপির একটি মামলায় প্রায় এক কোটি ৬৭ লাখ টাকা ও বিএম এনার্জির একটি মামলায় প্রায় তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা ভ্যাট জড়িত।

অপরদিকে, কমিশনারেট থেকে সাতটি মামলায় জড়িত ভ্যাট পরিশোধে নোটিশ (সার্টিফিকেট) জারি করা হয়েছে, যাতে জড়িত ভ্যাট প্রায় ১১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইউনিভার্সেল গ্যাসের প্রায় ৪৩ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার এলপির প্রায় দুই কোটি ৭৬ লাখ টাকা ও বিএম এনার্জির প্রায় আট কোটি চার লাখ টাকা ভ্যাট জড়িত।

এনবিআর সূত্রমতে, লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)-এর উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ে একটি আদেশ জারি করে। যাতে বলা হয়, এলপিজির উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট নির্ণয়, পরিশোধ করার পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্টীকরণ করতে ২০২১ সালের ১ মার্চ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এনবিআরকে একটি চিঠি দেয়। পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য এলপিজি একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও পরিশোধবান্ধব জ্বালানি। সে জন্য সরকার এলপিজির মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে এনবিআর উৎপাদন বা বোতলজাতকরণ ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরবরাহের বিপরীতে ভ্যাট নির্ণয়, পরিশাধ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে। মূসক আইন, ২০১২ এর তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী এলপি গ্যাসের ওপর উৎপাদন পর্যায়ে সরবরাহ মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত হবে। এক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত প্রযোজ্য হবে না। বিইআরসি কর্তৃক পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্য এলপিজির ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। মূসক আইন, ২০১২-এর তৃতীয় তফসিলের অনুচ্ছেদ-৩ অনুযায়ী পেট্রোলিয়াম জাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট ২ শতাংশ। এক্ষেত্রেও রেয়াত প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ এনবিআরের এই আদেশের ফলে ২০২১ সালের মার্চ থেকে উৎপাদন পর্যায়ে ৫ শতাংশ ও স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ২ শতাংশ হারে কোম্পানিগুলো দিতে হবে। তবে কোম্পানিগুলো মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট পরিশোধ করলেও স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ২ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করেনি।

অপরদিকে, এনবিআরের এই আদেশ জারির পর এলপিজি কোম্পানিগুলো স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে ২ শতাংশ ভ্যাট নিয়ে বেকায়দায় পড়ে। কোম্পানিগুলোর মতে, ২ শতাংশ হারে স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট ডিস্ট্রিবিউটরদের দেয়ার কথা। কিন্তু এনবিআর ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে আদায় করতে পারে না বিধায় কোম্পানিগুলোর ওপর ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপরও কোম্পানিগুলো এই ভ্যাট পরিশোধে সময় চেয়ে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে। ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এলপিজি কোম্পানিগুলোর সংগঠন এলপিজি অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) থেকে চিঠি দেয়া হয়; যাতে ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এই ভ্যাট কার্যকর করতে অনুরোধ করা হয়। তবে চিঠির জবাবে এনবিআর জানায়, ২০২১ সালের মার্চ থেকে এই ভ্যাট দিতে হবে। কোম্পানিগুলো উচ্চ আদালতে রিট করেছে। কিন্তু আদালত ওই সময় কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বা স্থগিতাদেশ দেয়নি।

এই বিষয়ে সম্প্রতি এলওএবি প্রেসিডেন্ট আজম জে চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক আদায় তো আমাদের কাজই নয়। এটা ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে আদায় করার কথা। আমরা দেবো কেন? তাদের থেকে এনবিআর আদায় করতে পারে না বিধায় আমাদের থেকে নিচ্ছে। আপনারা তো এই বিষয়ে এনবিআরকে ২০২১ সালে চিঠি দিয়েছেন, তারা কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এনবিআর আমাদের চিঠির কোনো অ্যাকশন নেয়নি। উল্টো আমাদের বলেছেন, এখন থেকে পে (পরিশোধ) করেন, আমরা পরিশোধ করছি। এখন বলছে আগেরগুলো পরিশোধ করতে হবে। আপনারা কি উচ্চ আদালতে (রিট করেছেন) গিয়েছেন, আদালত কোনো স্থগিতাদেশ বা আদেশ দিয়েছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ওই সময়ই (২০২১) রিট করেছি। বেঞ্চ এখনও ঠিক হয়নি। অবকাশকালীন ছুটির পর ঠিক হবে। এখন তো এলপিজি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট অফিস বকেয়া ভ্যাট পরিশোধে চিঠি দিচ্ছেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এমনিতে এলপিজির ব্যবসা খারাপ। ব্যবসা বন্ধ করে দিলেই হয়।